সিকিম, ২৩ জুলাই:
কয়েকদিনের টানা উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে শেষ হল সিকিমের নামচি জেলার সমরদুঙ এলাকায় এনএইচপিসি (NHPC)-র তিস্তা স্টেজ–৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনার উদ্ধারকাজ। মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণের পর ধসে পড়া সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে মোট ২৫ জন শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন নর্থ বেঙ্গলের আইজি সুকেশ জৈন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একাধিক রাজ্যের শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১১ জন শ্রমিক রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আইজি সুকেশ জৈন জানান, উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সফলভাবে অভিযান সম্পূর্ণ করেছে। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া ২৫টি মৃতদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৭ জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে তাঁদের মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বাকি মৃতদেহগুলিও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আইজি আরও জানান, গত দু’দিন ধরে উদ্ধারকারী দল শুধু সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে শ্রমিকদের দেহ উদ্ধারই করেনি, পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা, মৃতদেহ শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা এবং মরদেহ যথাযথভাবে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, “আজ পুরো উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ হয়েছে। উদ্ধারকারী বাহিনীর সব সদস্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেছেন।”
এদিন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং (গোলে)। তিনি উদ্ধারকাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিক, পুলিশ, এনডিআরএফ এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। মুখ্যমন্ত্রী দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত নির্ধারণ করতে বিশেষজ্ঞদের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনওভাবেই এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য নির্মীয়মাণ প্রকল্পগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার উপর জোর দেওয়া হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার নির্দেশও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার নামচির সমরদুঙ এলাকায় এনএইচপিসির তিস্তা স্টেজ–৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে হঠাৎ মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের জেরে সুড়ঙ্গের ভিতরে ব্যাপক ধস নামে এবং বহু শ্রমিক ভিতরে আটকে পড়েন। দুর্ঘটনার পরপরই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।
উদ্ধারকাজে অংশ নেয় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সিকিম পুলিশ, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর এবং ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ECL)-এর বিশেষ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল। সুড়ঙ্গের ভিতরে বিষাক্ত গ্যাস, ধস এবং সীমিত জায়গায় কাজ করার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দিনরাত এক করে উদ্ধার অভিযান চালান তাঁরা।
সিকিম সরকার ইতিমধ্যেই নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, সিকিম, উত্তরাখণ্ড এবং পাঞ্জাবের বাসিন্দারা। কর্মসংস্থানের আশায় ভিনরাজ্যে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের একাধিক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
এখন সকলের নজর উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দিকে। ঠিক কী কারণে সুড়ঙ্গে মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রুখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর। ততদিন পর্যন্ত এই মর্মান্তিক টানেল বিপর্যয় দেশের অন্যতম বড় শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবেই আলোচনায় থাকবে।

