সুরঞ্জিৎ ধর :
শৈশবের সেই রংবেরঙের আইসক্রিম এখন আর তেমন সহজলভ্য নয়। বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিম পাওয়া গেলেও, পুরনো দিনের সেই স্বাদ এবং শৈশবের স্মৃতি এখন অনেকটা ম্লান। বছরকুড়ি পঁচিশ আগে
শৈশবের সেই রংবেরঙের আইসক্রিমের স্মৃতি চোখে ভেসে উঠলে মনে পড়ে যায় অনেক পুরনো কথা। বিদ্যালয়ের টিফিন কিংবা ছুটির ঘন্টার ঢং ঢং আওয়াজ আজও মনের মণি কোঠায় এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিদ্যালয়ের বাইরে অপেক্ষারত ভাঙ্গা সাইকেলের পেছনে লাল কাঠের বাক্স, বয়স প্রায় পঞ্চাশ ছুই ছুই হবে কালো সাদা সংমিশ্রণ একগাল ভর্তি দাড়ি ভেদ করে মৃদু মিষ্টি হাসি আজও ভুলতে পারিনি, চোখে পাওয়ারের চশমা ভেদ করে আমাদের খুঁজতো খোকারা কখন আসবে বিদ্যালয়ে টিফিন কখন হবে বা কখন ছুটি হবে। প্রখরোধকে উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা আইসক্রিম দাদুর কথা হয়তো আমরা কেউ ভুলিনি। শুধুমাত্র আইসক্রিম বিক্রি নয় বিদ্যালয় এর ছুটি এবং টিফিন টাইম, গরমের ছুটি কবে হবে তিনি জানতেন এবং আমাদেরকে বলেও দিতেন যে খোকা আগামী সপ্তাহ থেকে গরমের ছুটি হবে তোমাদের সাথে একমাস দেখা হবে না। আরো বিভিন্ন রকম গল্প হতো। শুধু আমাকেই নয় বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটা ছাত্রর মুখ ওই আইসক্রিম দাদুর একেবারে চেনা এবং অধিকাংশ ছাত্রের নাম তিনি জানতেন। শৈশবের আইসক্রিমগুলোতে ছিল বিশেষ একটি স্বাদ ছিল যা এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। স্বাদের পাশাপাশি ছিল মধুমাখা শৈশবের এক মিষ্টি স্মৃতি। সময়ের সাথে পাল্লা দিতে কর্মব্যস্ততায় আমরা ভুলে গেছি সেই আইসক্রিম দাদুকে। বিদ্যালয় এর পাশ দিয়ে কখনো গেলে মনে পড়ে সেই আইসক্রিম দাদুর কথা তিনি এখন কোথায় আছেন সেটাও আমরা জানি না বা আমরা হয়তো কেউ খোঁজ রাখি না।
শুধুমাত্র বিদ্যালয় নয়, শৈশবের স্মৃতির কাঠিওয়ালা আইসক্রিম বাড়ির মায়ের সাথেও রয়েছে অনেক স্মৃতি। গরমের ছুটি পড়েছে বিদ্যালয় বন্ধ। আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের শৈশবকালে ঘুরতে যাওয়া মানে মামার বাড়ি। এক সপ্তাহ মামারবাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর। মায়ের বকুনি এবং গৃহ শিক্ষকের পক্ষ থেকে চাপ পড়তো বিদ্যালয় ছুটির এক মাসের হোম ওয়ার্ক। হোমওয়ার্ক মানে ৩০ দিনের ৩০ পাতা হাতের লেখা। ৩০ টা অংক বাড়ি থেকে করে আনতে হবে, স্কুল খুললে জমা দিতে হবে। তাই সেই হোম ওয়ার্ক গুলো করার সময় ছিল দুপুরবেলা। কারণ সকাল বেলা গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়তে যেতাম এর পরে বাড়িতে এসে টিফিন করে সাদাকালো টিভিতে দূরদর্শনে ছুটি ছুটি সিরিয়াল দেখতাম। তারপরে কিছুটা সময় বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে স্নান করে খাওয়া দাওয়া করে হোমওয়ার্ক গুলো করতাম। স্বভাবত আমি আমার কথা বলছি, আমি দুপুরবেলা হোম ওয়ার্ক করতাম কারণ হলো যাতে দুপুরবেলা ঘুমোতে না হয়। তাড়াতাড়ি বিদ্যালয় এর হোমওয়ার্ক গুলো করে আবার বিকেল বেলা বন্ধুদের সাথে খেলতে মাঠে যেতে হবে। সেকালের গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে বাংলা হাতের লেখা লিখছি হঠাৎই মায়ের বকুনির মাঝেও বাড়ির সমস্ত কোলাহলকে ভেদ করে একটি মিষ্টি সুর মৃদু মৃদু কানে আসতে লাগলো। আইসক্রিম লাগবে আইসক্রিম, আওয়াজ শুনতেই মায়ের কাছে বায়না শুরু মা পঞ্চাশ পয়সা বা ১ টাকা দেবে একটা আইসক্রিম খাব কালকে থেকে চাইবো না। কখনো বা দিতেন আবার কখনো বা বকুনিও খেতে হতো। আবার সেই সময় সব থেকে বড় মিথ্যা কথা শুনতে হতো নর্দমার জল দিয়ে আইসক্রিমগুলো বানায় ওগুলো খাস না ভালো না। আজ থেকে ২০-২৫ বছর কোচবিহারের শহর এবং শহর সংলগ্ন যে সমস্ত নাগরিকরা রয়েছেন তাদের হয়তো এখনো মনে আছে কোচবিহারের রাজপথে মাইক বাজিয়ে ঘুরে বেড়াতে একটি আইসক্রিমের বিজ্ঞাপন হত সেটি হলো বাবুর নিতাই কুলপি মালাই। শৈশবের সেই কুলপি এখনো স্মৃতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। এই লাল হলুদ সাদা সবুজ কাঠিওলা আইসক্রিম খাবার জন্য কিছু সময় বাড়ির দোকান খরচা আনতে যেতাম সেখান থেকে এক টাকা বা ৫০ পয়সা সরিয়েও রাখতাম। এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার এপাশ-ওপাশ দেখতাম এবং অপেক্ষা করতাম কখন আইসক্রিম ওয়ালা আসবে। সত্যিই সেই দিনগুলো ছিল কত রঙিন আজও ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই শৈশবে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে দিনের পর দিন পৃথিবীর তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধ্বমুখী। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই তপ্ত গরমে সকলের বাড়িতে বাড়িতেই রয়েছে রেফ্রিজারেটর, সেখানে ঠান্ডা জল এবং দোকান থেকে কিনে আনা বিভিন্ন নামিদামি ব্রান্ডের আইসক্রিমের বার বেশিরভাগ শহর কিংবা গ্রামের বাড়িতে পাওয়া যায়। কিন্তু আজও মনে পড়ে সেই শৈশবের বিভিন্ন রঙের কাঠিওয়ালা আইসক্রিম সেই সময় দাম ছিল খুবই অল্প বর্তমান সময়ে সেই পয়সা দোকানদাররা নিতে চায় না 50 পয়সা কিংবা এক টাকা ছিল সেই সময়ের সেই আইসক্রিমের মূল্য। আজকে আমরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামিদামি কোম্পানির ১০০ টাকা দেড়শ টাকা ৩০ টাকা ২০ টাকা দিয়ে আইসক্রিম খাই কিন্তু শৈশবের সেই কাঁঠিয়ালা আইসক্রিম হাতে পেলে যে আনন্দ এবং যে স্বাদ উপভোগ করতাম সেটার এখন পাই না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির শহরে ব্যস্ততায় কোথায় যেন কণ্ঠ রোধ করে দিয়েছে সেই আইসক্রিম দাদুর সে আর এখন বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হাক দিতে দিতে যায় না আইসক্রিম লাগবে আইসক্রিম। আজও কানের শ্রুতি পর্দা খুঁজে বেড়ায় সেই আইসক্রিম দাদুর হাক।বাজারে এখন বিভিন্ন স্বাদের আইসক্রিম পাওয়া যায়, যেমন – চকোলেট, ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, ইত্যাদি কিন্তু শৈশবের সেই কাঠিওয়ালা আইসক্রিমের কাছে সমস্ত কিছুই ফিকে হয়ে যায়।

