সাদা অর্কিড, মায়া মেঘের শহর-কার্সিয়াং
আজ‘ঘোরা ঘুরি’তে পাহাড়ের রাজকুমারী , সাদা অর্কিডের শহর । লিখেছেন – সৌমি চক্রবর্তী।
দার্জিলিং থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৮৬৪ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত খারসাং, লেপচা ভাষায় যার অর্থ ‘সাদা অর্কিডের দেশ’ কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে এখন আমাদের সকলের পরিচিত কার্শিয়াং। পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে সবুজ, সেখানে মেঘ সরিয়ে ঝিকঝিকিয়ে এগিয়ে চলে টয়ট্রেন ।
শিলিগুড়ি থেকে এই শহরের দূরত্ব প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। দার্জিলিং যাওয়ার পথে কেবল হাফ স্টে নয় এই শহর হয়ে উঠতে পারে উইকেন্ড ডেস্টিনেশন। বছরের যেকোনো সময় বিশেষত আমার ব্যক্তিগত পছন্দ বর্ষায় জল ছাপ কার্শিয়াং, মায়াময়। রোহিনী পেরোতেই পাকদন্ডী পথ, গরম ধোঁয়া ওঠা মোমোর রেশ কাটতেই চা বাগানের সবুজ গালিচা। পাহাড়ের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো ঘর।
আনুমানিক ১৮৩৫ সালে তৎকালীন সিকিমের চোগিয়াল (রাজা) কার্সিয়াংয়ের মালিকানা ব্রিটিশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। ধীরে ধীরে ব্রিটিশ আমলে, কর্মকর্তাদের পছন্দের গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর জায়গা হয়ে ওঠে এই শহর, এখনো সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ আমলের বাংলো তাই হয়তো মেঘ মুলুক কার্শিয়াং জুড়েই ভয়ের গন্ধ। কার্শিয়াং এর ছোট্ট গ্রাম ডাউহিলের কুয়াশা পথে কান পাতলে শোনা যায় অশরীরী গল্প। সে গল্প না হয় পরের পাতায় শোনাবো।
আপাতত বলি এই শৈলশহরে আপনারা কী কী ঘুরে দেখতে পারেন।
কার্শিয়াং পৌছে চলে যেতে পারেন গিদ্দা পাহাড়ে, চোখের সীমানা অবধি এখানে শুধুই সবুজ, পাহাড়ের ঢালে নীচু হয়ে আসে আকাশ, হাওয়ায় অদ্ভুত শান্তি।
ইগলস ক্রেগ সত্যিই পাখির চোখ, এখান থেকে দেখা যায় গোটা ভ্যালি ও শিলিগুড়ি। আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকে দেখা মিলতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘারও। এছাড়াও রয়েছে আম্বতিয়া শিব মন্দির, ডিয়ার পার্ক, ফরেস্ট মিউজিয়াম ।
রয়েছে নেতাজী সুভাষচন্দ্র ইন্সটিটিউট ফর এসিয়ান স্টাডিজ, হেরিটেজ বাংলোটি নেতাজির দাদা স্বাধীনতা সংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসু ১৯২২ সালে কিনে নেন সেই সময়ের অসম পুলিশের ডেপুটি সুপার পিটার লেসলির কাছ থেকে। ১৯৩৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরে পর্যন্ত ৬ মাস নেতাজি এই বাড়িতে ব্রিটিশের হাতে গৃহবন্দি ছিলেন। হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ এই বাড়িতে বসেই লেখা। এখান থেকে গান্ধীজি ও জহরলাল নেহেরুকেও তিনি চিঠি লিখেছেন। সবটাই সুরক্ষিত সংগ্রহশালায়। রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন ক্যামেলিয়ায় সংগ্রামের গন্ধ, ১৯৩৪ সালে শরৎ চন্দ্র বসুর হাতে লাগানো। এই আর্কাইভ ইতিহাস আমাদের শুনিয়েছেন বর্ষীয়ান রক্ষক পদমবাহাদুর হেরি। হাতে বেশ কিছু্ক্ষণ সময় নিয়ে যেতে হবে এই বাংলোয়।
আছে নিরিবিলি গ্রাম চিমনি আর ছমছমে ডাওহিল। মকাইবাড়ী চা বাগান ও সুন্দর। কাছেই হনুমান টক এবং ভিউ পয়েন্ট। ভালো চা, সসেজ আর ক্যারট কেক খেতে ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারেন মার্গারেটস ডেক-এ। ডেক থেকে চা বাগানে বৃষ্টি, মেঘ ফাটা রোদ আমাদের কার্সিয়াং ট্রিপের ‘cherry on top’।
রাত্রিবাসের ঠিকানা ও সঠিক সময়
বছরের বিভিন্ন সময়ে কার্শিয়াং ঘুরতে যান বহু মানুষ সেইজন্য এখন এখানে বহু হোমস্টে। তবে আমাদের রাতের ঠিকানা বরাবরের মতো নিরিবিলিতে কার্শিয়াং বাজার থেকে বেশ খানিকটা দূরে সানি সাইড ইকো হোমস্টে। এ যেন শহরের মধ্যে ছোট্ট এক গ্রাম, কয়েক ধাপ সিড়ি উঠে বেশ কয়েকটি ছোটো ছোটো কটেজ। কটেজে বড়ো বড়ো কাঁচের জানলা দিয়ে সারাদিন মেঘ বৃষ্টির খেলা দেখেই কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে। ক্যাম্পিং এর জন্য রয়েছে তাবু।
ঘরের ভাড়া 2000 টাকা প্রতি রাত, তিনজন শেয়ার করতে পারেন। ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। খাওয়া দাওয়া ইচ্ছা মতো, চার্জ খাবার অনুযায়ী তবে আহামরী বেশী কিছু নয়।
কীভাবে যাবেন?
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে কার্শিয়াং এর দূরত্ব ৪৮ কিমি। ছোট গাড়ী ভাড়া- ২৫০০-৩০০০/-
বড় গাড়ী –৩০০০-৩৫০০/–
তুলিতে আঁকা শহর, গায়ে সেপিয়া টোন, গা ছমছমে পাহাড় আর টয়ট্রেনের ধোঁয়ায় মেঘ। সামনে বর্ষা বন্ধ জঙ্গল, লম্বা ছুটিও নেই, উইকেএন্ডে ঘুরে আসুন কার্শিয়াং-সাদা অর্কিড, মায়া মেঘের শহর।
সব শেষে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য বানানো একটি রীল পোস্ট করলাম

