শিলিগুড়ি , ১৩ জুলাই
ছোটবেলায় যে অভিনেতার ছবি কেটে ডায়েরি বানাতেন, সেই অভিনেতার সামনেই একদিন নিজের সাফল্যের গল্প লিখবেন— এমন স্বপ্ন হয়তো অনেকেই দেখেন, কিন্তু তা বাস্তবে পূরণ করতে পারেন খুব কম মানুষ। শিলিগুড়ির বাসিন্দা জয়িতা পালের জীবনে সেই স্বপ্নই এবার সত্যি হলো। জি বাংলার জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘দাদাগিরি আনলিমিটেড’ সিজন ১১-এর দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম পর্বে বিজয়ী হয়ে তিনি শুধু ট্রফিই জেতেননি, বরং নিজের দীর্ঘদিনের আবেগ, পরিশ্রম এবং বিশ্বাসেরও জয় নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিযোগিতার শুরুটা খুব সহজ ছিল না। মাঝপথে একটি ভুল উত্তরে পিছিয়ে পড়লেও হাল ছাড়েননি জয়িতা। গুগলি রাউন্ডে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে প্রতিপক্ষের তিনটি প্রশ্নের সঠিক চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বড় স্কোর তুলে নেন। সেই লড়াকু মানসিকতাই তাঁকে পৌঁছে দেয় ফাইনালে। শেষ রাউন্ডে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও তাঁর স্কোর নিরাপদ অবস্থায় ছিল। অন্য প্রতিযোগী মাইনাসে নেমে যাওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী জয়ীর মুকুট ওঠে জয়িতার মাথায়। পুরস্কার হিসেবে তিনি পান দাদাগিরির ট্রফি, নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং একাধিক সম্মাননা।
তবে এই জয়ের আসল গল্প শুরু হয় বহু বছর আগে। স্কুলজীবনে পকেট খরচের টাকা জমিয়ে অভিনেতা দেবের ছবি কিনে ডায়েরি তৈরি করতেন জয়িতা। সংবাদপত্র থেকে দেবকে নিয়ে প্রকাশিত খবর কেটে যত্ন করে সংরক্ষণ করতেন। দেবের সিনেমার গান লিখতে গিয়ে পড়াশোনায় মন না দেওয়ায় মায়ের বকুনি, এমনকি মারও খেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সেই ভালোবাসা কখনও কমেনি। আজও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে দেবকে নিয়ে তৈরি ছয়টি স্মৃতির ডায়েরি।
শুটিংয়ের দিন সেই ডায়েরির একটি সঙ্গে নিয়ে যান জয়িতা। ২০১১ সালে তৈরি সেই বিশেষ ডায়েরিতে নিজের হাতে স্বাক্ষর করেন অভিনেতা দেব। শুধু তাই নয়, রথযাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ দেবের প্রতিকৃতি এবং দেব অভিনীত বিভিন্ন সিনেমার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ উপহারও তুলে দেন তাঁর হাতে। মঞ্চে প্রিয় অভিনেতার সঙ্গে নাচের সুযোগও পান তিনি, যা তাঁর কাছে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
মঞ্চে জয়িতাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘রিয়েল লাইফ টনিক’ হিসেবে। কারণ, দেব অভিনীত জনপ্রিয় ছবি ‘টনিক’-এ তিনি যেমন ট্যুর প্ল্যানারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, বাস্তব জীবনেও জয়িতা গত আট বছর ধরে একজন সফল ট্যুর প্ল্যানার। নিজের সংস্থার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ পরিকল্পনার পাশাপাশি কর্পোরেট পর্যায়েও কাজ করছেন তিনি।
জয়িতা বলেন, “আমি দেবকে শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকে একটাই স্বপ্ন ছিল, কোনোদিন ওঁর সামনে দাঁড়াব। আজ একই মঞ্চে খেলা, নাচ, কথা বলা, নিজের হাতে বানানো ডায়েরিতে ওঁর স্বাক্ষর নেওয়া— এর থেকে বড় প্রাপ্তি আমার জীবনে আর হতে পারে না।”
জয়িতার স্বামী সুদীপন গুহ জানান, “ওর জীবনে দেবের প্রতি ভালোবাসা অনেক পুরনো। অডিশন থেকে প্রতিটি ধাপে আমি পাশে ছিলাম। কাজের জন্য শুটিংয়ে যেতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মঞ্চে দেবদা আমার নাম উল্লেখ করেছেন এবং ফ্লাইং কিসও দিয়েছেন। সেটাও আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত।”
শিলিগুড়ির সুভাষপল্লিতে বেড়ে ওঠা জয়িতা বর্তমানে ঝংকার মোড় এলাকায় থাকেন। সম্প্রতি শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত অডিশন থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর কলকাতায় শুটিং এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর ট্রফি— গোটা পথটাই যেন এক স্বপ্নের মতো।
জয়িতার এই সাফল্য শুধু একটি রিয়্যালিটি শো জেতার গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, শৈশবের স্বপ্নকে যদি নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায় দিয়ে লালন করা যায়, তবে একদিন সেই স্বপ্নই বাস্তবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে করতালির শব্দে ধরা দেয়।

