শিলিগুড়ি, ১৪ জুলাই:
পাহাড়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় অনুষ্ঠিত হল এক উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় বৈঠক। রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামার উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, জিটিএ-র শীর্ষ আধিকারিক, জেলা প্রশাসনের আধিকারিক এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে মূলত পাহাড়ের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতি, বর্ষাকালে ধস মোকাবিলার প্রস্তুতি, উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি, জিটিএ-র আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাহাড়ের উন্নয়নে যাতে প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, সেই বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে অতীতে তৈরি করা প্রায় ২০০ কোটি টাকার ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট (ডিপিআর) বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা জানান, সাধারণ মানুষের প্রকৃত উপকারে আসে না—এমন প্রকল্পগুলিকে আর গুরুত্ব দেওয়া হবে না। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কিছু প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেগুলি নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিশাল লামার বক্তব্য, কিছু প্রকল্প শুধুমাত্র ঠিকাদার ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির স্বার্থকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই কারণেই জিটিএ-র কাজকর্মে স্বচ্ছতা আনতে একটি বড় ধরনের ‘সাফাই অভিযান’ শুরু করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর পাহাড়ে বাস্তবভিত্তিক ও জনমুখী উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা বৈঠকের পর জানান, পাহাড়ের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, জিটিএ-র প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেটের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর (এনবিডিডি)-এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তুতি চলছে।
পাহাড়ের মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে পানীয় জল, রাস্তা, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মানুষ যাতে সমান সুযোগ ও অধিকার পান, সেটিই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
বৈঠকে জিটিএ-র অধীনে চলা বড় প্রকল্পগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা হয়। জানা গিয়েছে, ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রায় ৫০টি প্রকল্পের উপর বিভাগীয় তদন্ত ও অডিট প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রকল্পগুলিতে কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা গাফিলতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এই তদন্তের দায়িত্ব আরও উচ্চতর সংস্থার হাতে দেওয়া হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। ভারতের মহালেখা নিরীক্ষক বা সিএজি (CAG), এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) অথবা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর মতো সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, সেই বিষয়ে রাজ্য সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে সাংসদ রাজু বিস্তা স্পষ্ট করে জানান, জিটিএ-র সাংবিধানিক মর্যাদা ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান রেখেই সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনেই পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক মহলের মতে, উত্তরকন্যার এই বৈঠক পাহাড়ের উন্নয়ন ও জিটিএ-র ভবিষ্যৎ কার্যপ্রণালীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একদিকে যেমন পুরনো প্রকল্পগুলির পর্যালোচনা ও আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

