শিলিগুড়ি, ৭ ফেব্রুয়ারী :
হাতির তাণ্ডবে ভিটেমাটি ছাড়া ৫০ পরিবার। গ্রাম বদলে গেল চা-বাগানে,স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে কামাতপাড়া স্কুল। প্রকৃতি বনাম মানুষের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হলো বন্যপ্রাণেরই। শিলিগুড়ি সংলগ্ন বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল ঘেঁষা সাজানো চটকিয়াভিটার কামাত পাড়া আজ কেবল ইতিহাসের পাতায়। হাতির ক্রমাগত তাণ্ডবে অতিষ্ঠ হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে লড়াই থেকে সরে দাঁড়াল মানুষ। জনবসতির কোলাহল ছাপিয়ে সেখানে এখন শুধুই চা বাগানের নিস্তব্ধতা আর হাতির পায়ের ছাপ। যেখানে জন বসতি ছিল,আজ সেখানে চা বাগান। একসময় কামাত পাড়া গ্রামে প্রায় ৫০টি পরিবারের বসবাস ছিল। চাষবাস,ছোটখাটো কাজ,দৈনিক মজুরির কাজ নিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটত গ্রামবাসীদের। ২০১০ সাল নাগাদ বদলে যায় এই গ্রামের চেনা ছবিটা। জঙ্গল থেকে প্রতি রাতেই লোকালয়ে হানা দিতে শুরু করে হাতির পাল। বসতি বাড়তেই রাতের পাশাপাশি দিনের বেলাতেও খাবারের খোঁজে চলে আসে হাতি। শুধু ঘরবাড়ি ভাঙা নয়,হাতির আক্রমনে প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী। প্রাণের ভয়ে অবশেষে গ্রাম ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন বাসিন্দারা। অনেক আশা নিয়ে গড়া বসতি ছেড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে একে একে সমস্ত পরিবার অন্যত্র চলে গেলে গ্রামটি জনমানবহীন হয়ে পড়ে। আজ সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশাল চা বাগান। হাতির আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও। গ্রামের একমাত্র বিদ্যাপিঠ ‘কামাতপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়’আজ পরিত্যক্ত। স্থানীয়দের কথায়,হাতির ভয়ে শিশুরা স্কুলে যেতে চাইত না। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষালাভ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পড়ুয়াদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে শিক্ষা দপ্তর স্কুলটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়। পরিত্যক্ত স্কুল ভবনটি আজ কেবল এক যন্ত্রণাময় স্মৃতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলঘেঁষা নির্জনে। গ্রামটি অবলুপ্ত হলেও হাতির উপদ্রব কিন্তু থামেনি। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে এখনও প্রতি রাতে হানা দিচ্ছে বন্যপ্রাণীর দল। বৈকুণ্ঠপুর বনবিভাগের ডাবগ্রাম২ রেঞ্জের অধীন চটকিয়াভিটা বিট অফিসের বনকর্মীদের প্রতি রাতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতি তাড়াতে ছুটতে হচ্ছে। আজ যেখানে চা বাগান,সেখানে একসময় আমাদের ঘর ছিল,কচিকাঁচাদের কোলাহল ছিল। সব এখন অতীত। ভিটেমাটি হারিয়ে আমরা এখন উদবাস্তু। জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বন্যপ্রাণের এই আদিম দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়,এখন সেটাই দেখার বিষয়। কামাত পাড়া কেবল একটি গ্রামের নাম নয়,বরং বাস্তুহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি হয়ে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে।

