আলিপুরদুয়ার, ১৪ জুন:
বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে খুব শীঘ্রই বাঘ ছাড়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের বন ও পরিবেশ মন্ত্রী শঙ্কর কুমার ওঁরাও। রবিবার আলিপুরদুয়ার জেলার শিকিয়াঝোরা পর্যটন কেন্দ্রে এসে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। বনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তাঁর প্রথম আলিপুরদুয়ার সফর। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে বনমহল, পরিবেশপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
উল্লেখ্য, শঙ্কর কুমার ওঁরাও আলিপুরদুয়ার জেলার কুমারগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক। মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমবার নিজের জেলায় এসে তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
রবিবার বিকেলে বনমন্ত্রী প্রথমে পৌঁছান উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র শিকিয়াঝোরায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই এলাকাকে অনেকেই ‘উত্তরের আমাজন’ বলে অভিহিত করেন। ঘন সবুজ জঙ্গল, নদী, বন্যপ্রাণ এবং মনোরম পরিবেশের জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় জমান। বিশেষ করে শিকিয়াঝোরার নৌকাবিহার পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
সফরকালে বনমন্ত্রী নিজেও নৌকাবিহারে অংশ নেন। নদীপথে ভ্রমণের সময় তিনি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, বনভূমির অবস্থা এবং পর্যটন পরিকাঠামো সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। নৌকাবিহার শেষে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তিনি। এলাকার মানুষের অভাব-অভিযোগ, সমস্যা এবং উন্নয়নের বিভিন্ন প্রস্তাব মনোযোগ সহকারে শোনেন। পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছ থেকে পর্যটন ও বন সংরক্ষণ সংক্রান্ত নানা পরামর্শও গ্রহণ করেন।
এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বনমন্ত্রী জানান, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘ পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রস্তুতি চলছিল, তা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন, “বাঘের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খাদ্যশৃঙ্খল, বনাঞ্চলের পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তাই খুব শীঘ্রই বক্সার জঙ্গলে বাঘ ছাড়া সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
মন্ত্রী আরও জানান, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি শুধু বন দফতরের জন্য নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের জন্যই একটি বড় সুখবর হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে বক্সায় বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এবার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে বলেই ইঙ্গিত দেন তিনি।
বনমন্ত্রী বলেন, “বক্সা জঙ্গলকে আবার বাঘের স্বাভাবিক আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বনাঞ্চলের সুরক্ষা, শিকার রোধ, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার ফল এখন ধীরে ধীরে পাওয়া যাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, বাঘ অবমুক্ত করার দিনটি রাজ্যের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে পারে। সেই বিশেষ অনুষ্ঠানে রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বও উপস্থিত থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
শিকিয়াঝোরা সফরের সময় বনমন্ত্রী স্থানীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘের উপস্থিতি পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে এবং তার ফলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বনমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বক্সায় বাঘ ফিরলে একদিকে যেমন পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে পর্যটন শিল্পেরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে। তবে একইসঙ্গে বন্যপ্রাণ ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সতর্কতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে বনমন্ত্রীর এই সফর এবং বক্সা জঙ্গলে শীঘ্রই বাঘ ছাড়ার সম্ভাবনার ঘোষণা উত্তরবঙ্গের বন ও পর্যটন মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন সকলের নজর বন দফতরের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিনের দিকে, যেদিন বক্সার জঙ্গলে আবারও বাঘের গর্জন শোনা যাবে।

