জলপাইগুড়ি, ২৮ জুন:
গত কয়েকদিন ধরে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে ভারী বৃষ্টিপাত এবং সমতলে টানা প্রবল বর্ষণের জেরে ডুয়ার্স ও জলপাইগুড়ি জেলার প্রায় সমস্ত পাহাড়ি নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তা, জলঢাকা, চেল, ঘিস, ডায়না-সহ একাধিক নদী ফুলেফেঁপে ওঠায় নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর জলস্ফীতি বাড়তে থাকায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে নিচু এলাকা এবং নদীর অসংরক্ষিত তীরবর্তী গ্রামগুলির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
সেচ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, পাহাড় থেকে নেমে আসা জলের পরিমাণ প্রতি ঘণ্টায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীগুলির জলস্তর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় বিভিন্ন অসংরক্ষিত এলাকায় হলুদ (Yellow Alert) এবং প্রয়োজনে লাল (Red Alert) সতর্কতা জারির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মালবাজার মহকুমা এলাকায়। মালবাজার সংলগ্ন নদী ও ঝোরাগুলির জলস্তর ইতিমধ্যেই বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। গুরজং ঝোরা, শঙ্খিনী নদী এবং আশপাশের ছোট নদীগুলিও প্রবল স্রোতে ফুলেফেঁপে উঠেছে। ফলে নদীর ধারের এলাকাগুলিতে ভাঙন ও প্লাবনের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।
বিশেষ করে মালবাজারের ২ নম্বর ও ১১ নম্বর ওয়ার্ডের নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নদীর জল অনেক জায়গায় বাড়ির একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ায় বহু পরিবার রাত জেগে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে শুরু করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বছর বর্ষার সময় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, দ্রুত স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, গত ৪ অক্টোবর ২০২৫ ধূপগুড়ি ব্লকের গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক গ্রাম জলঢাকা নদীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল। সেই ঘটনায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং কৃষিজমি, বাড়িঘর ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। তবে সেই কাজ এখনও সম্পূর্ণ না হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, আবার যদি জলঢাকা নদী রুদ্ররূপ ধারণ করে, তাহলে গত বছরের মতো ফের বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এবং ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার আবারও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে।
এদিকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ও ব্লক প্রশাসন প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেচ দফতর, পুলিশ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মীদের সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে দ্রুত উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ শুরু করার জন্যও পরিকল্পনা তৈরি রাখা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই মাগুরমারী ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের জলঢাকা নদী সংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। নদীর ধারে অযথা ভিড় না করা, শিশুদের নদীর কাছাকাছি যেতে না দেওয়া এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন নিয়মিত নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ করছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীগুলির জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকে নজর রেখে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তবে নদীপাড়ের মানুষের একটাই দাবি—শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ এড়াতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদী সংস্কারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।

