কোচবিহার, ১৪ জুলাই:
প্রায় সাত দশকের ঐতিহ্য বহন করে চলা কোচবিহার শহরের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোচবিহার টাউন হাই স্কুল আজ পরিকাঠামোগত সংকটে জর্জরিত। একসময় জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই বিদ্যালয় বর্তমানে জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষের অভাব এবং নানা অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে অস্তিত্বের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তথা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু। পরিদর্শনের পর বিদ্যালয়ের উন্নয়নে তাঁর বিধায়ক তহবিলের প্রথম বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করার আশ্বাস দেন তিনি।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কোচবিহার টাউন হাই স্কুল দীর্ঘদিন ধরে শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল। প্রতিষ্ঠার মাত্র দু’বছরের মধ্যে, ১৯৫৯ সালে বিদ্যালয়টি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ধাপে ধাপে শিক্ষার পরিসর বাড়তে থাকে। ১৯৬২ সালে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমোদন মেলে এবং ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ চালু হয়। বর্তমানে কোচবিহার শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো ক্রমশ ভেঙে পড়েছে। বহু শ্রেণিকক্ষের ছাদ ও দেওয়াল জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একাধিক ক্লাস পরিচালনায় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশে সংস্কারের প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হলেও অভিযোগ, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমিত পরিকাঠামো, নানা অসুবিধা এবং আর্থিক সংকট সত্ত্বেও ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখছেন তাঁরা। তবে তাঁদের মতে, শুধুমাত্র আন্তরিক প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
একসময় এই বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে বহু ছাত্র-ছাত্রী প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ফলে কোচবিহারের শিক্ষার ইতিহাসে এই বিদ্যালয়ের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পরিকাঠামোর অবনতির কারণে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এর ফলে ছাত্রসংখ্যা ও বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক তথা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে দেখা করে স্কুল পরিদর্শনের অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন, শ্রেণিকক্ষ এবং পরিকাঠামো ঘুরে দেখার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন এবং তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনেন।
পরিদর্শনের পর রথীন্দ্রনাথ বসু জানান, বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে দ্রুত পরিকাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, বিধায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম বিধায়ক তহবিলের অর্থ এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব উন্নয়নের কাজ শুরু করার চেষ্টাও করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
স্পিকারের এই ঘোষণায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রাক্তনীরাও মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে যদি দ্রুত সংস্কারের কাজ শুরু হয়, তাহলে বিদ্যালয়টি আবার তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পেতে পারে।
এখন সকলের নজর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দিকে। ঘোষণার পর কত দ্রুত উন্নয়নের কাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘদিনের পরিকাঠামোগত সমস্যা কতটা দূর করা সম্ভব হয়, সেটাই দেখার। কোচবিহারের মানুষের প্রত্যাশা, জেলার এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবারও নতুন রূপে শিক্ষার আলো ছড়াবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলবে।

