জাহাজের ডেকে চা-এ চুমুক, উপাখ্যানে মার্গারেটের পাহাড়ী ভালোবাসা
আজ‘ঘোরা ঘুরি’তে মার্গারেটের গল্প । লিখেছেন – সৌমি চক্রবর্তী।
শহরে ধোঁয়া ওঠা গরম, চোখ চাইছে সমুদ্র, অতল জল কিংবা পাহাড়ী পথে কুয়াশার মেঘ। আজ চা চুমুকের ঠিকানা যে ক্যাফের কথা বলবো তা পাহাড়ী বাঁকে।
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে টুং স্টেশনের কয়েকশো গজ দূরত্বে চা বাগানের পাশে,পাহাড়ের ঢালে জাহাজের ডেক আকৃতির ঝুলন্ত টি লাউঞ্জ- মার্গারেটস ডেক।
খোলা বারান্দা থেকে দেখা যায় চা বাগানের ঢালু পাহাড় মেঘের চাদরে শাদা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি তখন পাহাড় জুড়ে বর্ষা, দমকা হাওয়ায় ইউরোপীয় কন্যের ভালোবাসার গল্প।
১৮৬২ সাল নাগাদ শুরু হয়েছে চা বোনার কাজ সেইসময় নাম ছিল ছোটা রিংটং (কেউ কেউ বলে বাডা রিংটং )। তৎকালীন চা বাগানের ইউরোপীয় ম্যানেজার মিঃ ক্রুইকশ্যাঙ্ক পরিবার নিয়ে এই বাগানেই থাকতেন। তার ছোট মেয়ে মার্গারেট, পাহাড়, ঢালের সবুজ চা বাগান, উত্তরের প্রকৃতি তাকে মায়ায় বেঁধেছে। রোগ বড় বালাই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের সঙ্গে পাড়ি দিতে হলো ইংল্যান্ডে। মেঘের কাছে, পাকদন্ডী রাস্তায় লেখা রইলো ফিরে আসার কথা। ব্যাধি প্রাণ কাড়ল। আদুরে মেয়ের স্মৃতি, ফিরে আসার ইচ্ছে আজীবন সাজিয়ে রাখতে ক্রুইকশ্যাঙ্ক চা বাগানের নাম বদলে রাখলেন ‘মার্গারেট হোপ’, তার পাশেই তৈরী হলো ডেকের আদলে এই ‘মার্গারেট ডেক টি লাউঞ্জ’।
মার্গারেটের ডেকে সামনের অংশ লবি, সেখানে ছোট আউটলেটে পাবেন দার্জিলিং সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন ধরনের চা। লাউঞ্জে রয়েছে এসি রেস্তোরা এবং সামনে খোলা বারান্দা। কন্টিনেন্টাল কুইজিন, চায়ের সঙ্গে এখানে বিনামূল্যে ল্যান্ডস্কেপে পাহাড়, মেঘের ছোঁয়া। প্রায় পঞ্চাশ জনের বসবার জায়গা আছে। বর্তমানে ঐতিহাসিক হোপ চা বাগান ও লাউঞ্জটির দায়িত্ব গুডরিক গ্রুপের।
কী কী রয়েছে মেনুতে:
প্রথমেই বলি পাহাড়ের কমফোর্ট ফুড মোমো, থুকপা এখানে পাওয়া যাবে না। জাহাজের ছবি সাজানো মেনুতে রয়েছে হরেক রকম চা যেমন দার্জিলিং ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকেন্ড ফ্লাশ, মনসুন ফ্লাশ এবং বিদেশী মাসকাটেল চা। রয়েছে আসাম চা। টি পট এবং গুডরিকের কাপে সার্ভ করা হয় এই চা। অত্যন্ত সুস্বাদু, এক পট চা তিনজনের জন্য যথেষ্ট। সঙ্গে নিয়ে নিতে পারেন বিভিন্ন ধরণের কেক এবং কুকিজ, আমরা নিয়েছিলাম ক্যারট কেক, চা এর সঙ্গে এর জুড়ি দূর্দান্ত। গ্রিন টি কুকিজ-ও চেখে দেখতে পারেন।
ক্রোয়েসেন্টস, গ্রিলড ফিশ, স্কোনস, ব্রাউনি চিজ কেকও রয়েছে মেনুতে।
মার্গারেটে ডেকের পর্ক সসেজ বিখ্যাত। সসেজ, বেকন সহ ব্রেকফাস্ট প্ল্যাটার অন্যতম আকর্ষণ।
দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার হিসেবে নিতে পারেন বিভিন্ন ধরনের স্যুপ, পাই, স্টাফড চিকেন এবং স্প্যাগেটি, রয়েছে ফ্রুট কাস্টার্ড, ক্যারামেল কাস্টার্ড।
এনএইচ-৫৫, হিলকার্ট রোডের উপর কার্শিয়াং- এ চায়ের ওয়ানস্টপ, আমরা পোঁছেছিলাম শেষ দুপুরে। অঝোর বৃষ্টিতে অপলক দেখেছি, বিকেলে হঠাৎ মেঘ সরে সূর্যের শেষ আভা সবুজে। ধীরে আলো নিবেছে আকাশের, ডেকে তখন সন্ধ্যা, স্তব্ধ সময় বুঝিয়ে দিলো কেন ফিরতে চেয়েছিল মার্গারেট…।
দার্জিলিং যাবার পথে ইতিহাস আর ভালোবাসার মায়া গন্ধে চা, বিরতিতে জিরিয়ে নিতে পারেন মার্গারেটেস ডেক-এ।

