কোচবিহার, ২২ জুন:
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অর্থ বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠল কোচবিহার ১ নম্বর ব্লকের চান্দামারী অঞ্চল। আবাস যোজনার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সেই অর্থ ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভে সামিল হন এলাকার বাসিন্দারা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার চান্দামারী অঞ্চলের ৪/৭২ নম্বর বুথ এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আবাস যোজনার সুবিধাভোগীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি আবাস প্রকল্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাড়ি নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কিছু মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযোগের কোনও সুরাহা না হওয়ায় এদিন ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদে নামেন।
বিক্ষোভকারীরা চান্দামারী অঞ্চলের অঞ্চল সভাপতি শিবু বর্মনের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান। তাঁরা স্লোগান দিতে থাকেন এবং কাটমানির টাকা ফেরতের দাবি তোলেন। শুধু অঞ্চল সভাপতির বাড়ির সামনেই নয়, এলাকার এক পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া উচিত। একইসঙ্গে যাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবিও জানান তাঁরা। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটতে পারেন তাঁরা।
ঘটনার জেরে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে চাপের মুখে রাখা হতো। তাঁদের দাবি, অঞ্চল সভাপতি, পঞ্চায়েত সদস্য, বুথস্তরের কিছু নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ জমা পড়ছিল। সেই ক্ষোভই এদিন প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে।
এদিকে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং ভোটের সময় ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত অঞ্চল সভাপতি শিবু বর্মনের পরিবারের পক্ষ থেকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। শিবু বর্মনের মা জানান, তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার কোনও ভিত্তি নেই। তবে তিনি বলেন, “যদি কেউ কোনও টাকা নিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে এলাকায় নতুন করে জল্পনা ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনায় রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হয়েছে। এলাকার বিজেপি বুথ সভাপতির দাবি, আবাস যোজনাকে কেন্দ্র করে কাটমানি, রাজনৈতিক চাপ এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছিল। তাঁর মতে, প্রশাসনের কাছে বারবার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে এবং তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বিক্ষোভে।
বর্তমানে গোটা বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে তুমুল আলোচনা চলছে। আবাস যোজনার টাকা বণ্টন প্রক্রিয়া, কাটমানির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো অভিযোগগুলির সত্যতা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। সাধারণ মানুষের দাবি, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য সামনে আনা হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
চান্দামারীর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের নজর কোচবিহারের ওই এলাকায়। আগামী দিনে প্রশাসন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অভিযোগগুলির তদন্ত কতদূর এগোয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

