আলিপুরদুয়ার, ২৩ জুলাই:
বকেয়া বেতন এবং কাজের নিশ্চয়তার দাবিতে আন্দোলনের পথে নামলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। তাঁদের কর্মবিরতির জেরে বৃহস্পতিবার বন্ধ হয়ে যায় আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতাল এবং আলিপুরদুয়ার পৌরসভার অধীন ‘মা আহার’ ক্যান্টিনের পরিষেবা। ফলে মাত্র পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবারের উপর নির্ভরশীল শতাধিক সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, রোগীর পরিজন এবং অসহায় মানুষের চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আলিপুরদুয়ার পৌরসভার মা আহার ক্যান্টিনে রান্নার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে বিক্ষোভে সামিল হন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যারা। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় পাঁচ মাস ধরে বেতন বকেয়া রয়েছে। এর পাশাপাশি পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রায় ১৫ জন কর্মীকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে বকেয়া বেতন দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া এবং সকল কর্মীর কাজের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবিতে তাঁরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
বিক্ষোভরত মহিলাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে নিয়মিত কাজ করে আসছেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেরই পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস এই কাজ। অথচ বেতন তো মিলছেই না, উল্টে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন।
অন্যদিকে, এই কর্মবিরতির সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার দুপুরেও কলেজ হল্ট সংলগ্ন মা আহার ক্যান্টিন এবং আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের মা আহার ক্যান্টিনে পাঁচ টাকার বিনিময়ে খাবার খেতে বহু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দিনমজুর, রিকশাচালক, পথচলতি শ্রমজীবী মানুষ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের আত্মীয়-পরিজন এবং সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা বহু মানুষ।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও খাবার পরিবেশন শুরু না হওয়ায় উদ্বেগ ছড়ায়। পরে ক্যান্টিন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কর্মীরা বিক্ষোভে সামিল হওয়ায় এদিন কোনও রান্নাই হয়নি। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে। অনেকেই দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, মা আহার প্রকল্প বহু গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক উদ্যোগ। মাত্র পাঁচ টাকায় পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই পরিষেবার উপর নির্ভর করেন। তাই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সমাজের প্রান্তিক মানুষরাই।
অন্যদিকে আন্দোলনরত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং কোনও কর্মীকে অন্যায়ভাবে ছাঁটাই না করার লিখিত আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা কাজে ফিরবেন না বলেও জানিয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলিপুরদুয়ার শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে কর্মীদের ন্যায্য দাবির প্রশ্ন, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের খাদ্য পরিষেবা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুত সমস্যার সমাধান করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এখন সকলের নজর পৌরসভা প্রশাসনের দিকে। বিক্ষোভরত কর্মীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানসূত্র বের করে ‘মা আহার’ ক্যান্টিনের পরিষেবা স্বাভাবিক করা যায় কি না, সেটাই দেখার।

