আলিপুরদুয়ার, ১৭ জুন:
জেলার পর্যটন শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন, বনাঞ্চলের সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বুধবার জলদাপাড়ার এনআইসি ভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বন ও পরিবেশমন্ত্রী মনোজ কুমার ওঁরাও। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মন, প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, বনদপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, প্রশাসনিক কর্তারা এবং পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে জলদাপাড়া ও আলিপুরদুয়ার জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও প্রসারিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে কীভাবে পর্যটনের বিকাশ ঘটানো যায়, পর্যটকদের জন্য আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায় এবং স্থানীয় যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকের বিশেষ আকর্ষণ ছিল পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের সঙ্গে বনমন্ত্রীর মতবিনিময়। জঙ্গল সাফারির গাইড, সাফারি গাড়িচালক, হোমস্টে মালিক, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাঁদের সমস্যার কথা মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পর্যটক পরিষেবা পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা, সাফারি সংক্রান্ত নিয়মাবলি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য আরও উন্নত পরিষেবার দাবি জানান তাঁরা। বনমন্ত্রী মনোযোগ সহকারে তাঁদের বক্তব্য শোনেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
মন্ত্রী বলেন, বন সংরক্ষণ এবং পর্যটনের উন্নয়ন—এই দুই ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়েই সরকার কাজ করছে। বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করেই পর্যটনের পরিধি বাড়ানো হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে বনমন্ত্রী জলদাপাড়ার ঐতিহাসিক হলং বন বাংলোর পুনর্নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত এই বন বাংলোর পুনর্গঠন কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখেন তিনি। পরিদর্শনের সময় তিনি জানান, ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ মেনে হলং বন বাংলোর পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ কাঠের নির্মাণ সম্ভব না হলেও কংক্রিট ব্যবহার করে বাংলোটির ঐতিহ্যবাহী ও পুরনো স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পর্যটকরা আগের মতোই হলং বাংলোর সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের স্বাদ পাবেন।”
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৫০-এর দশকে নির্মিত হলং বন বাংলো দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র ছিল। প্রকৃতির কোলে অবস্থিত এই বাংলোতে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, প্রশাসনিক কর্তা, গবেষক এবং প্রকৃতিপ্রেমীরা সময় কাটিয়েছেন। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এটি ছিল পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য।
কিন্তু ২০২৪ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঐতিহাসিক এই বাংলোটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই মাদারিহাট ও জলদাপাড়ার পর্যটন শিল্পে এক ধরনের হতাশার ছায়া নেমে আসে। যদিও পর্যটকদের আগমন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবুও হলং বন বাংলো দর্শনের সুযোগ না থাকায় অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। পর্যটকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল—কবে আবার ফিরে আসবে উত্তরবঙ্গের এই ঐতিহ্যবাহী বন বাংলো?
বর্তমানে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে শুরু করেছে। দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে পুনর্নির্মাণের কাজ। প্রশাসন ও বনদপ্তরের আশা, নতুন রূপে সাজানো হলং বন বাংলো চালু হলে শুধু জলদাপাড়া নয়, সমগ্র উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্প নতুন গতি পাবে। একইসঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
বনমন্ত্রীর এই সফর এবং প্রশাসনিক বৈঠককে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, হলং বন বাংলোর পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের পর্যটনে আবারও সুদিন ফিরে আসবে এবং জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান তার হারানো জৌলুস পুনরুদ্ধার করবে।

