তুফানগঞ্জ, ৭ জুলাই:
অভাবের সংসার, প্রতিবন্ধকতা কিংবা দীর্ঘ এক যুগের দীর্ঘ বিচ্ছেদ—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তার অদম্য প্রতিভাকে। নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ১২ বছর পর, দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিকের মঞ্চ কাঁপিয়ে অবশেষে নিজের ঘরে ফিরে এল তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের বালাকুঠির কৃতি কন্যা মায়া বর্মন। এক যুগ পর অলিম্পিক জয়ী মেয়েকে ফিরে পেয়ে বর্মন পরিবারে এখন আনন্দের বন্যা, আর মায়ার এই আন্তর্জাতিক সাফল্য দেখে গর্বিত গোটা এলাকা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৫ সালে পেটের জ্বালায় ও চরম অভাবের তাড়নায় ঘর ছেড়ে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিল তখনকার ১৭ বছরের মূক-বধির কিশোরী মায়া বর্মন। ট্রেনে চড়ে সে উত্তর দিনাজপুরে পৌঁছে গেলে, সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (সি-ডব্লিউ-সি) মাধ্যমে হাওড়ার বাগনানের একটি সরকারি আবাসনে পাঠানো হয়। কথা বলতে না পারায় দীর্ঘ ১২ বছর তার আসল পরিচয় বা পরিবারের সন্ধান মেলেনি। তবে সম্প্রতি আবাসন কর্তৃপক্ষ তার আধার কার্ড তৈরির উদ্যোগ নিলে, আঙুলের ছাপ স্ক্যান করার সময় পূর্বের বায়োমেট্রিক তথ্য সামনে আসে। সেখান থেকেই জানা যায় তার বাড়ির ঠিকানা। এরপর হোম কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় এক শিক্ষকের যৌথ উদ্যোগে মায়াকে সসম্মানে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়।
তবে এই ১২ বছরে বাগনানের সরকারি আবাসনে মায়ার জীবন এক রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছিল। নিজের সবটুকু প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সে ক্রীড়াজগতে এক অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব অর্জন করেছে। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিকে ভভলিবল খেলায় অংশ নিয়ে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছে মায়া। শুধু আন্তর্জাতিক ভলিবলই নয়; ফুটবল, অঙ্কন, নাচ—সব ক্ষেত্রেই মায়ার বহুমুখী প্রতিভা রাজ্য ও জেলা স্তরে বারবার প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে।
১২ বছর পর অলিম্পিয়ান মেয়েকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত বাবা মনো বর্মন বলেন, “এত বছর পর মেয়েকে ফিরে পাব ভাবিনি, তাও আবার দেশের নাম উজ্জ্বল করা অলিম্পিয়ান হিসেবে! দিনমজুরির সংসারে আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, নিজের কোনো জমিজমা নেই। কিন্তু আজ আমরা অত্যন্ত খুশি ও গর্বিত। মায়ার এই আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিভা যাতে আরও এগিয়ে যেতে পারে, তার জন্য আমরা সরকার ও সমাজের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা কামনা করছি।”
মায়াকে ফিরিয়ে আনার মূল রূপকার, দক্ষিণ বালাকুঠি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুকুল বর্মা বলেন, “হাওড়ার হোমে গিয়ে যখন মায়ার এই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরের সাফল্যের খতিয়ান দেখলাম, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে শুধু আমাদের ব্লকের বা জেলার নয়, গোটা দেশের গর্ব। তবে মেয়েটির পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ; বাবা ভীষণ অসুস্থ এবং মা অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চালান। তাই আন্তর্জাতিক স্তরের এই কৃতি খেলোয়াড়ের প্রতিভার বিকাশ ধরে রাখাটাই এখন আমাদের সবার দায়িত্ব। আমি ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন ও বিডিওর সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছি।”
অপর শিক্ষিকা শম্পা দেবনাথও জানান, মায়ার মতো আন্তর্জাতিক স্তরের অ্যাথলেটের ভবিষ্যৎ যাতে সুরক্ষিত হয় এবং এই চরম আর্থিক অনটনের কারণে তার খেলাধুলা যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, তার জন্য ক্রীড়া দপ্তরের বিশেষ আর্থিক ও পরিকাঠামোমূলক উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তুফানগঞ্জ-২ ব্লক প্রশাসনের এক আধিকারিক মায়ার এই অভাবনীয় কৃতিত্বকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলেন, “মেয়েটি আমাদের ব্লকের মস্ত বড় গৌরব। ইতিমধ্যেই তার জন্য মানবিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।” তবে এলাকাবাসীর দাবি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পতাকা ওড়ানো এই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন খেলোয়াড় যাতে এই অতিদরিদ্র পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত মানের ক্রীড়াচর্চার সুযোগ পায়, তার জন্য ক্রীড়া মন্ত্রকের সরাসরি এগিয়ে আসা উচিত।

