জলপাইগুড়ি, ২৩ জুলাই:
দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের দাবিতে ফের আন্দোলনের সুর চড়াল চা শ্রমিক সংগঠনগুলি। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের যৌথ মঞ্চ জয়েন্ট ফোরাম-এর উদ্যোগে জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের করলাভ্যালি চা বাগানে একটি গেট সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বিপুল সংখ্যক চা শ্রমিক অংশ নেন। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন শ্রমিক নেতারা।
সভা থেকে চা শ্রমিকদের স্বার্থে ১১ দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি করলাভ্যালি চা বাগানের ম্যানেজারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, বহু বছর ধরে বিভিন্ন দাবি জানানো হলেও তার অধিকাংশই আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জয়েন্ট ফোরামের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ন্যূনতম মজুরি আইন অনুযায়ী অবিলম্বে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ঘোষণা ও কার্যকর করা। পাশাপাশি মাসিক বেতনভোগী শ্রমিকদের বেতন চুক্তির দ্রুত নবীকরণ, যন্ত্রচালিত কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য দক্ষতার ভিত্তিতে উচ্চতর মজুরি নির্ধারণ এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নয়নের দাবি জানানো হয়।
এছাড়াও অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার আওতায় খাদ্যশস্য বণ্টনে অনিয়ম বন্ধ, চা বাগানে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বিশ্রামাগার ও শিশুদের জন্য ক্রেশ নির্মাণ, শ্রমিকদের ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালোভাবে তোলা হয়। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, চা বাগানের বহু এলাকায় এখনও মৌলিক পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে, যার ফলে শ্রমিকদের প্রতিদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সভা থেকে আরও দাবি জানানো হয় শ্রমিক-বিরোধী শ্রম কোড অবিলম্বে প্রত্যাহার, বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চা আইন আধুনিকীকরণ, এবং দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও পরিত্যক্ত চা বাগানগুলি দ্রুত পুনরায় চালু করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। শ্রমিক সংগঠনগুলির মতে, বন্ধ চা বাগানের কারণে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাই চা শিল্পকে বাঁচাতে এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।
গেট সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শ্রমিক নেতারা বলেন, চা শিল্প উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আজও নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁদের দাবি, সরকার এবং চা বাগান কর্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে সমস্যাগুলির সমাধানে উদ্যোগী না হয়, তাহলে আগামী দিনে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
এদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চা শ্রমিক নেতা গোবিন ওরাও, শুভাশিস সরকার-সহ জয়েন্ট ফোরামের বিভিন্ন শরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁরা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং দাবি আদায়ের আন্দোলন আরও জোরদার করার বার্তা দেন।
সভা শেষে শ্রমিকদের ১১ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি করলাভ্যালি চা বাগানের ম্যানেজারের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়। জয়েন্ট ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দাবিগুলির বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে চা শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থে আগামী দিনেও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

