তুফানগঞ্জ, ১৯ জুলাই:
রবিবার ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আতঙ্ক ছড়াল তুফানগঞ্জ শহরের ইলেকট্রিক মোড় এলাকায়। আচমকা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে সারিবদ্ধ একাধিক দোকান। আগুনের তীব্রতায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও খাবারের দোকানসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ডে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা। আকস্মিক এই ঘটনায় গোটা তুফানগঞ্জ শহরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তুফানগঞ্জ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকা হল ইলেকট্রিক অফিস রোড। এই রাস্তাতেই রয়েছে বিদ্যুৎ দপ্তর, বিএলআরও অফিস, এইচডিএলআরও অফিস এবং এনএন উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই এলাকায় মানুষের ব্যাপক যাতায়াত থাকে। রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ইলেকট্রনিক্স, সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, খাবারের দোকানসহ নানা ধরনের দোকান থাকায় এলাকাটি ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত।
রবিবার ভোরে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে দোকানগুলির দিক থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে একের পর এক দোকানে। খবর পেয়ে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে আগুন নেভানোর প্রাথমিক চেষ্টা চালালেও আগুনের তীব্রতার কাছে তা ব্যর্থ হয়। এরপর দ্রুত খবর দেওয়া হয় দমকল বিভাগে।
খবর পেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় দমকলের দুটি ইঞ্জিন। দমকল কর্মীরা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে আগুন নেভানোর কাজ চালান। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নেভানোর আগেই একাধিক দোকানের সমস্ত মালপত্র পুড়ে যায়। দোকানের ভেতরে থাকা দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, আসবাবপত্র, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সরঞ্জাম আগুনে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কথায়, রবিবার ভোরে আগুন লাগার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে দেখেন দোকানগুলিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সেই দৃশ্য চোখের সামনে দেখেও কিছুই করার ছিল না। অনেকেই অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে নিজেদের বহু বছরের পরিশ্রম মুহূর্তের মধ্যে আগুনে পুড়ে যেতে দেখেন। তাঁদের দাবি, দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তৎপরতার সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে না আনলে আশপাশের আরও বহু দোকান ও ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারত। দমকল কর্মীদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসাও করেছেন তাঁরা।
এদিকে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। দমকল সূত্রে খবর, ক্ষতিগ্রস্ত ইলেকট্রনিক্স ও সাউন্ড সিস্টেমের দোকানগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, অতিরিক্ত তাপের কারণে ব্যাটারিতে বিস্ফোরণ অথবা শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। আগুনের প্রকৃত কারণ জানতে দমকলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ওই এলাকায় দাহ্য ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও ব্যাটারি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসায়িক এলাকায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিয়মিত বৈদ্যুতিক লাইনের পরীক্ষা এবং অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানোরও দাবি উঠেছে।
রবিবারের এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে বহু ব্যবসায়ীর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আগুনে ভস্মীভূত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের কাছে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পুনর্বাসনের আবেদন জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটন করে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

