জলপাইগুড়ি, ১৪ জুন:
প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবল তুষারপাত এবং তুষারধসের আশঙ্কার মধ্যেও সাহস, ধৈর্য ও অদম্য মানসিক শক্তির পরিচয় দিলেন জলপাইগুড়ির একদল পর্বতারোহী। নির্ধারিত সিসিকেএন (CCKN) শৃঙ্গ জয়ের মূল লক্ষ্য পূরণ না হলেও, সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ১৯ হাজার ফুট উচ্চতার একটি অনামী শৃঙ্গ জয় করে ফিরলেন জলপাইগুড়ির নেচার অ্যান্ড ট্রেকার্স ক্লাবের সদস্যরা। তাঁদের এই সাফল্যে খুশির হাওয়া বইছে পর্বতারোহণ মহল থেকে শুরু করে জেলার ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যেও।
জানা গেছে, সম্প্রতি উচ্চ হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে সিসিকেএন শৃঙ্গ অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন নেচার অ্যান্ড ট্রেকার্স ক্লাবের সদস্যরা। অভিযাত্রী দলে ছিলেন দলনেতা ভাস্কর দাস, বিজয় চক্রবর্তী, অরিন্দম জানা, সৌম্যদীপ দাস, রাগেশ্রী বৈশ্য-সহ আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার পর তাঁরা অভিযানে অংশ নেন।
অভিযানের অংশ হিসেবে ১১ জুন দলটি ১৭,৬৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত প্রথম শিবির থেকে যাত্রা শুরু করে। কঠিন পথ অতিক্রম করে তাঁরা ১৮,৪০০ ফুট উচ্চতায় দ্বিতীয় শিবির স্থাপন করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানেই শুরু হয় প্রকৃত লড়াই। দ্বিতীয় শিবির স্থাপনের কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়ার দ্রুত অবনতি ঘটে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় প্রবল তুষারপাত এবং ঝোড়ো হাওয়া। তুষারপাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অভিযাত্রীদের তাঁবুগুলি প্রায় বরফের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সারা রাত কার্যত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে কাটাতে হয় পর্বতারোহীদের। তাঁবুর ওপর জমে থাকা ভারী বরফ বারবার সরিয়ে দিতে হয় যাতে তাঁবু ভেঙে না পড়ে। প্রচণ্ড ঠান্ডা, প্রবল বাতাস এবং অনবরত তুষারপাতের মধ্যে রাতভর জেগে থেকে পরিস্থিতি সামাল দেন তাঁরা। অভিযাত্রীদের মতে, অভিযানের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলির মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।
পরদিন সকালেও আবহাওয়ার কোনও উন্নতি হয়নি। বরং তুষারের স্তর আরও বাড়তে থাকায় তুষারধসের আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দলনেতা ভাস্কর দাস নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযানের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেই অনুযায়ী দলটি দ্বিতীয় শিবির থেকে নেমে প্রথম শিবিরে ফিরে আসে। কিন্তু সেখানেও আবহাওয়ার কোনও উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁদের মূল শিবির তথা বেস ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য হতে হয়।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি অভিযাত্রীরা। কয়েকদিন অপেক্ষার পর ১৩ জুন আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে আসতেই নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন দলনেতা ভাস্কর দাস। তিনি বেস ক্যাম্প সংলগ্ন একটি অনামী শৃঙ্গ আরোহণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই লক্ষ্য নিয়ে ভাস্কর দাস, বিজয় চক্রবর্তী এবং অমিত দাসের তিন সদস্যের একটি বিশেষ দল নতুন করে অভিযানে বেরিয়ে পড়ে।
শুরু হয় আবারও কঠিন লড়াই। দুর্গম বরফে ঢাকা পথ, খাড়া ঢাল এবং উচ্চতাজনিত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে প্রায় ছয় ঘণ্টার টানা পরিশ্রমের পর তাঁরা ১৯,০০০ ফুট উচ্চতার অনামী শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। চূড়ায় পৌঁছে জাতীয় পতাকা ও ক্লাবের বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন অভিযাত্রীরা। সেই মুহূর্তটি ছিল গোটা দলের কাছে অত্যন্ত গর্ব ও আবেগের।
লাংজা থেকে দলনেতা ভাস্কর দাস জানান, এলাকায় এখনও আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। মাঝে মাঝেই তুষারপাত এবং প্রবল ঠান্ডা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তবে প্রতিটি সদস্য নিরাপদ রয়েছেন। যদিও দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং উচ্চতাজনিত চাপে অনেকেই শারীরিকভাবে ক্লান্ত ও অবসন্ন, তবুও মানসিকভাবে সবাই দৃঢ় এবং ইতিবাচক রয়েছেন।
অভিযানে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের মধ্যে ছিলেন অমিত দাস, জনক কোচ, সৌম্যদীপ দাস, বিজয় চক্রবর্তী, হিল্লোল রায়, অরিন্দম জানা, সৌম্যদীপ জানা এবং রাগেশ্রী বৈশ্য। প্রত্যেকেই নিজেদের দক্ষতা, সাহস এবং দলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে এই কঠিন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
পর্বতারোহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও নির্দিষ্ট শৃঙ্গ জয় করাই শুধু সাফল্যের মাপকাঠি নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প লক্ষ্য অর্জনের মধ্যেও প্রকৃত অভিযাত্রীর সাফল্য নিহিত থাকে। সেই দিক থেকে বিচার করলে জলপাইগুড়ির নেচার অ্যান্ড ট্রেকার্স ক্লাবের এই অভিযান নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত শৃঙ্গ জয় সম্ভব না হলেও ১৯ হাজার ফুট উচ্চতার অনামী শৃঙ্গ জয় করে জলপাইগুড়ির এই পর্বতারোহীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন— অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সাহস থাকলে কোনও বাধাই শেষ কথা নয়।

