শিলিগুড়ি, ১৫ জুলাই:
গ্ল্যামার জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মালদার দুই নাবালিকা ছাত্রীর বাড়ি ছাড়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে উত্তরবঙ্গ জুড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণির ওই দুই কিশোরীকে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা প্রভাবিত করছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। মঙ্গলবার তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল, শিলিগুড়িতে পৌঁছলেই একজন ব্যক্তি তাদের নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাবেন এবং সেখানে মডেলিং ও বিনোদন জগতে কাজের সুযোগ করে দেবেন। তবে মালদা ও শিলিগুড়ি পুলিশের যৌথ তৎপরতায় সময়মতো তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তদন্তকারীদের অনুমান, এটি শুধুমাত্র দুই কিশোরীকে ঘিরে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর নেপথ্যে আরও বড় মানবপাচার চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার দুই কিশোরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পরও কোনও সন্ধান না মেলায় মালদা থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। পাশাপাশি প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয় এবং দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দুই কিশোরীর ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষও তাদের খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারেন।
এই তথ্য দ্রুত পৌঁছে যায় শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কাছেও। এরপর কমিশনারেটের পক্ষ থেকে এনজেপি-সহ বিভিন্ন থানাকে সতর্ক করা হয় এবং সম্ভাব্য রুটে নজরদারি বাড়ানো হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, একটি নির্দিষ্ট যাত্রীবাহী বাসে করে দুই কিশোরী শিলিগুড়ির দিকে আসছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনালে বাসটি পৌঁছানোর আগেই নৌকাঘাট এলাকায় অভিযান চালায় এনজেপি থানার পুলিশ। বাসে উঠে যাত্রীদের মধ্যে থেকে দুই কিশোরীকে চিহ্নিত করা হয় এবং নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপে সম্ভাব্য বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উদ্ধারের পর দুই কিশোরীকে এনজেপি থানার মহিলা হেল্প ডেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। রাত প্রায় পৌনে ১১টা নাগাদ মালদা থেকে এক কিশোরীর বাবা থানায় পৌঁছন এবং মেয়েকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ ও তৎপরতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
এদিন মালদার বিজেপি নেত্রী ও প্রাক্তন বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীও এনজেপি থানায় পৌঁছে দুই কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, গত প্রায় সাত মাস ধরে মোবাইল ফোন এবং অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে দুই কিশোরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে বিদেশে মডেলিং, অভিনয় এবং গ্ল্যামার জগতে কাজের লোভ দেখানো হয়। তদন্তকারীদের মতে, এই ধরনের প্রতারণায় প্রথমে বড় স্বপ্ন দেখিয়ে নাবালক-নাবালিকাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, এরপর তাদের পাচারের চেষ্টা করা হয়।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ছিল শুধুই একটি প্রলোভন। প্রকৃত পরিকল্পনা ছিল প্রথমে দুই কিশোরীকে আলিপুরদুয়ারে নিয়ে যাওয়া। সেখান থেকে ভুটান সীমান্ত ব্যবহার করে অন্যত্র পাচারের ছক কষা হয়েছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। যদিও এই তথ্য এখনও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের অংশ এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, চ্যাট হিস্ট্রি এবং ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের ধারণা, এই চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত থাকতে পারে এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে কিশোর-কিশোরীদের টার্গেট করে আসছে। সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, সন্তানদের মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের উপর নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, বিদেশে চাকরি বা গ্ল্যামার জগতে সুযোগের প্রলোভন কিংবা অস্বাভাবিক কোনও প্রস্তাব পেলেই দ্রুত প্রশাসনকে জানানো উচিত। কারণ সময়মতো সতর্কতা ও পুলিশের তৎপরতাই এ ধরনের মানবপাচার বা প্রতারণার বড় চক্র ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়া বা অন্যত্র পাচারের সম্ভাবনা এবং সংঘবদ্ধ চক্রের যোগসূত্র সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

