আলিপুরদুয়ার, ১৫ জুলাই:
মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই ফের জলমগ্ন হয়ে পড়ল আলিপুরদুয়ারের হ্যামিল্টণগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তাঘাট, বাজার, বসতবাড়ি—সবখানেই জমে যায় হাঁটুসমান জল। বহু পরিবারের বাড়িতে জল ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় বাসিন্দাদের। প্রতি বছরের মতো এবারও বর্ষার শুরুতেই জলযন্ত্রণার পুরনো ছবি ফিরে আসায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে হ্যামিল্টণগঞ্জে এই সমস্যা লেগেই রয়েছে। অথচ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নর্দমা পরিষ্কারের কাজ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে তার কোনও সুফল মেলেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘পাড়ায় সমাধান’ প্রকল্পের আওতায় হ্যামিল্টণগঞ্জের একাধিক এলাকায় নর্দমা পরিষ্কার এবং নিকাশি সংস্কারের কাজের সূচনা করা হয়েছিল। সরকারি নথিতে সেই কাজের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর কোনও কাজ হয়নি বলে দাবি বাসিন্দাদের। তাঁদের অভিযোগ, শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য কিছু অংশে সামান্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হলেও স্থায়ীভাবে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এর ফলেই বর্ষার প্রথম দফার বৃষ্টিতেই ফের পুরনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে হ্যামিল্টণগঞ্জবাসীকে। এলাকাবাসীর দাবি, নর্দমাগুলি আগের মতোই মাটি, পলি এবং আবর্জনায় ভরাট হয়ে রয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জল বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং সেই জল দ্রুত রাস্তাঘাট ছাপিয়ে বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। বহু পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শুধু ভারী বৃষ্টির সময়ই নয়, বৃষ্টি না থাকলেও নিকাশি ব্যবস্থা অচল থাকায় নর্দমায় দীর্ঘদিন জল জমে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর ফলে মশার উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন জলবাহিত ও মশাবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, বহুবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি জানানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান আজও হয়নি।
এলাকাবাসীদের আরও দাবি, ‘পাড়ায় সমাধান’ প্রকল্পের কাজ শুরুর সময়ই তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে শুধুমাত্র উপরিভাগে কাজ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেই পরামর্শ উপেক্ষা করেই প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। সরকারি প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এই প্রসঙ্গে বিজেপি নেতা অলক মিত্র অভিযোগ করে বলেন, ‘পাড়ায় সমাধান’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি বুথে প্রায় ১০ লক্ষ টাকার কাজ দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনও বুথেই সেই কাজের প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাঁর দাবি, যদি প্রকৃত অর্থে নর্দমা পরিষ্কার ও নিকাশি সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হতো, তাহলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই হ্যামিল্টণগঞ্জকে জলমগ্ন হতে হতো না। তাঁর অভিযোগ, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি বলেই সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
অলক মিত্র আরও জানান, হ্যামিল্টণগঞ্জের দীর্ঘদিনের নিকাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিশাল লামা উদ্যোগ নিয়েছেন। এই বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই জেলা শাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একটি বৃহৎ নিকাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হ্যামিল্টণগঞ্জের জলনিকাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য, আশ্বাস নয়, তাঁরা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চান। প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি আর মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত কার্যকর নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তুলে হ্যামিল্টণগঞ্জকে জলযন্ত্রণার হাত থেকে মুক্ত করার দাবিতে সরব হয়েছেন তাঁরা।

