আলিপুরদুয়ার, ২০ জুলাই:
জঙ্গলকেন্দ্রিক পর্যটনের জন্য পরিচিত ডুয়ার্সে প্রতি বছর বর্ষাকালে প্রায় তিন মাস পর্যটন শিল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজনন মৌসুমের কারণে জলদাপাড়া, চিলাপাতা, বক্সাসহ একাধিক জঙ্গলে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে। ফলে এই সময়ে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে হোটেল, রিসর্ট, গাড়ি চালক, গাইড, হোমস্টে, ছোট ব্যবসায়ী ও পর্যটননির্ভর হাজার হাজার মানুষের জীবিকায়।
এই পরিস্থিতিতে বর্ষার তিন মাসেও কীভাবে ডুয়ার্সে পর্যটনের চাকা সচল রাখা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেছে ইস্টার্ন ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। সোমবার মাদারিহাটে সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সদস্য, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা। মূল আলোচনার বিষয় ছিল বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে বিকল্প পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশ্বজিৎ সাহা জানান, বর্ষার সময় জলদাপাড়া, চিলাপাতা, বক্সা-সহ ডুয়ার্সের অধিকাংশ বনাঞ্চল পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে। ফলে বহু পর্যটক এই সময় ডুয়ার্সে আসার পরিকল্পনা বাতিল করেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। তাই শুধুমাত্র জঙ্গল সাফারির উপর নির্ভর না করে এমন কিছু পর্যটন আকর্ষণ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা বর্ষার সময়ও পর্যটকদের ডুয়ার্সমুখী করবে।
তিনি জানান, ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার সমৃদ্ধ জনজাতি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকসংগীত, নৃত্য, হস্তশিল্প, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামভিত্তিক পর্যটন, ঐতিহ্যবাহী জনজাতি জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা, স্থানীয় খাবারের উৎসব এবং প্রকৃতিনির্ভর বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করা গেলে বর্ষার সময়ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংগঠন।
এছাড়াও বৈঠকে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, চা-বাগান পরিদর্শন, গ্রামীণ হোমস্টে, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। সংগঠনের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বর্ষার তিন মাসেও পর্যটন শিল্প সচল থাকবে এবং স্থানীয় মানুষদের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বজিৎ সাহা আরও বলেন, “ডুয়ার্স শুধু জঙ্গল সাফারির জন্য নয়, এখানকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাও পর্যটনের বড় আকর্ষণ হতে পারে। আমরা চাই, সারা বছর পর্যটকের আনাগোনা বজায় থাকুক। সেই লক্ষ্যেই বিকল্প পর্যটনের একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।”
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, বর্ষাকালেও যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় কার্যক্রম গড়ে তোলা যায়, তাহলে হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টে, পরিবহণ, স্থানীয় দোকানপাট এবং পর্যটননির্ভর অন্যান্য ব্যবসাও সারা বছর সচল রাখা সম্ভব হবে। এতে ডুয়ার্সের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
সংগঠনের সদস্যরা আশা প্রকাশ করেছেন, প্রশাসন ও পর্যটন দপ্তরের সহযোগিতা পেলে খুব শীঘ্রই এই বিকল্প পর্যটন পরিকল্পনাগুলিকে বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। তাঁদের মতে, ডুয়ার্সকে শুধু শীতকালীন নয়, বরং বারোমাসের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

