শিলিগুড়ি, ২৪ জুলাই:
খুঁটি পুজোর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে আসন্ন শারদোৎসবের সূচনা করল শিলিগুড়ির সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন। দীর্ঘ ৭২ বছরের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে এবারও ব্যতিক্রমী ভাবনা, শিল্পসৌন্দর্য এবং সামাজিক বার্তার সমন্বয়ে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ নিয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটি। খুঁটি পুজোর দিন থেকেই ক্লাব প্রাঙ্গণে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের সদস্য, প্রবীণ উদ্যোক্তা, এলাকার বাসিন্দা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, পূজার্চনা এবং শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতির আনুষ্ঠানিক পর্ব।
এবার সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের দুর্গাপুজোর মূল ভাবনা ‘সুতোর টানে’। এই থিমের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের অদৃশ্য বন্ধন, সম্পর্কের গভীরতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সমাজে নারীর অপরিসীম অবদানকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা হবে। উদ্যোক্তাদের কথায়, একটি সুতো যেমন বিচ্ছিন্ন উপাদানকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়, তেমনই একজন নারী পরিবার, সমাজ এবং প্রজন্মকে ভালোবাসা, ত্যাগ, দায়িত্ব ও মমতার বন্ধনে আবদ্ধ রাখেন। সেই অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেই ‘সুতোর টানে’ থিমকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং প্রতিটি শিল্পকর্মে এই ভাবনাকে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করবেন শিল্পীরা। মণ্ডপে প্রবেশের পর থেকেই দর্শনার্থীরা একের পর এক শিল্প-ইনস্টলেশনের মাধ্যমে অনুভব করতে পারবেন মানুষের সম্পর্ক, আবেগ, স্মৃতি এবং সামাজিক বন্ধনের নানা দিক। ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পচিন্তার সংমিশ্রণে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হবে, যা শুধু চোখে নয়, মনেও গভীর ছাপ ফেলবে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মানুষ ক্রমশ ভার্চুয়াল যোগাযোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের থিম সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে—মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতাই সমাজকে শক্তিশালী করে। এই বার্তাই শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চায় সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন।
নারীর অবদানকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের ভাবনায়। একজন মা, বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যা—প্রত্যেক নারীই পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে অদৃশ্য এক ভালোবাসার সুতোয় বেঁধে রাখেন। তাঁদের আত্মত্যাগ, ধৈর্য, সংগ্রাম এবং স্নেহই একটি পরিবারের ভিতকে মজবুত করে। সেই অনন্য ভূমিকাকে শ্রদ্ধা জানাতেই থিমের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে স্থান পেয়েছে নারীশক্তি।
শুধু মণ্ডপ নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এবারের আয়োজন। দুর্গাপুজো উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, পরিবেশ রক্ষার বার্তা, বৃক্ষরোপণ, সমাজসেবামূলক উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একাধিক কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিকতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও এক বড় মঞ্চ।
বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে এবারের পুজোর প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন শিলিগুড়ির স্থানীয় শিল্পীরা। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, নাট্য পরিবেশনা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জমে উঠবে উৎসবের আসর। স্থানীয় প্রতিভাদের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁদের উৎসাহিত করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, প্রবীণদের সম্মাননা এবং মহিলাদের অংশগ্রহণে বিশেষ অনুষ্ঠানও আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
খুঁটি পুজোর দিন থেকেই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই পূজার্চনা, প্রসাদ বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। প্রবীণ সদস্যদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মও সমান উৎসাহে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিতে হাত লাগিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা গঠন, আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
দীর্ঘ ৭২ বছরের পথচলায় সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন শুধু একটি দুর্গাপুজো কমিটি হিসেবেই নয়, বরং এলাকার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর নতুন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীল উপস্থাপনা এবং সমাজমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের মন জয় করেছে এই পুজো। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবছরও শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য মেলবন্ধন উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা আয়োজকদের।
উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, ৭২তম বর্ষের এই বিশেষ আয়োজন শুধুমাত্র দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপ বা শিল্পকর্মের জন্য নয়, বরং মানুষের মনে সম্পর্ক, মানবিকতা এবং নারীশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার জন্ম দেবে। ঐতিহ্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিবাচক সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এবারের দুর্গোৎসবকে সাজিয়ে তুলছে সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন। তাই এবারের শারদোৎসবে শিল্প, আবেগ, ঐতিহ্য এবং মানবিকতার অনন্য মেলবন্ধনের সাক্ষী হতে দর্শনার্থীদের অপেক্ষায় রয়েছে শিলিগুড়ির এই ঐতিহ্যবাহী পুজো।

