বানারহাট, ২৩ জুলাই:
কয়েকদিনের আতঙ্কের অবসান। অবশেষে ডুয়ার্সের গয়েরকাটা চা বাগানের ১০ নম্বর সেকশনে বন দফতরের পাতা খাঁচায় ধরা পড়ল একটি পূর্ণবয়স্ক চিতা বাঘ। বুধবার গভীর রাতে পাতা ফাঁদে ধরা পড়ার পর বৃহস্পতিবার ভোরে শ্রমিকরা প্রথম বাঘটিকে দেখতে পান। খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকাল থেকে ঘটনাস্থলে ভিড় উপচে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় বন দফতরের কর্মীদের।
জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গয়েরকাটা চা বাগানের বিভিন্ন সেকশনে চিতা বাঘের আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। সন্ধ্যা নামলেই শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। চা বাগান সংলগ্ন এলাকা থেকে একাধিকবার ছাগল, বাছুর ও গরু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, রাতের অন্ধকারে চিতা বাঘ প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছিল। ফলে কাজে যাওয়া থেকে শুরু করে শিশুদের স্কুলে পাঠানো—সব ক্ষেত্রেই উদ্বেগে ছিলেন বাগানের বাসিন্দারা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বন দফতরের বিন্নাগুড়ি বন্যপ্রাণী স্কোয়াড এলাকায় নজরদারি শুরু করে। স্থানীয়দের অভিযোগ ও বাঘের চলাচলের সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখে বুধবার পাম্প হাউস সংলগ্ন এলাকায় একটি বিশেষ খাঁচা বসানো হয়। টোপ হিসেবে খাঁচার ভিতরে রাখা হয় একটি ছাগল। রাতভর নজরদারির পর ভোরের দিকে সেই ফাঁদেই ধরা পড়ে পূর্ণবয়স্ক চিতা বাঘটি।
বৃহস্পতিবার ভোরে কাজে যাওয়ার সময় কয়েকজন চা-শ্রমিক প্রথমে চিতা বাঘের গর্জন শুনতে পান। পরে পাম্প হাউসের কাছে গিয়ে দেখেন খাঁচার মধ্যে বন্দি অবস্থায় রয়েছে বাঘটি। মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা চা বাগান এবং আশপাশের এলাকায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। মহিলা, পুরুষ, প্রবীণ থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া—সকলেই খাঁচাবন্দি চিতাকে একনজর দেখতে এবং মোবাইলে ছবি ও ভিডিও তুলতে ভিড় করেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন দফতরের কর্মীদের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয় এবং বারবার সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
বন দফতরের আধিকারিকরা জানান, ধরা পড়া চিতাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের পর তাকে উপযুক্ত গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে, যাতে সে আবার লোকালয়ে ফিরে না আসে। পাশাপাশি এলাকায় আরও চিতা বাঘের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা জানতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো এবং টহলদারি জোরদার করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে দীর্ঘদিনের আতঙ্কের পর চিতা বাঘ ধরা পড়ায় কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন গয়েরকাটা চা বাগানের শ্রমিক ও বাসিন্দারা। তবে বন দফতরের পক্ষ থেকে সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনও বন্যপ্রাণী চোখে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে বা তাকে উত্ত্যক্ত না করে অবিলম্বে বন দফতরকে খবর দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন বনকর্মীরা।
ঘটনাটি ফের একবার প্রমাণ করল, ডুয়ার্সে জঙ্গল ও লোকালয়ের দূরত্ব কমে আসার ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত ক্রমশ বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় আরও সচেতনতা এবং নিয়মিত নজরদারির উপর জোর দিচ্ছে বন দফতর।

