শিলিগুড়ি, ১৬ জানুয়ারী :
শিলিগুড়ি মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই উত্তরবঙ্গের জন্য একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিলিগুড়ির মাটিগাড়ায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ করাই এই উদ্যোগগুলির মূল লক্ষ্য। পরিকাঠামো, পরিবহণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে একযোগে যে বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে, তা উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
উত্তরবঙ্গ সফরের প্রথম দিনেই শুক্রবার শিলিগুড়িতে বড়সড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রস্তাবিত ‘মহাকাল মহাতীর্থ’ মন্দিরের শিলান্যাস করেন তিনি। এই মন্দিরটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিব মন্দির হতে চলেছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। শিলান্যাসের আগে মঞ্চ থেকেই একাধিক সরকারি প্রকল্পের সূচনা ও ঘোষণা করা হয়।
যাত্রী পরিবহণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করতে নর্থ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অধীনে ছয়টি নতুন স্লিপার ভলভো বাস চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১.৩৬ কোটি টাকা। বাসগুলি শিলিগুড়ি–কলকাতা–দিঘা, আলিপুরদুয়ার–কলকাতা–দিঘা এবং কোচবিহার–কলকাতা–দিঘা রুটে চলবে। যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি আসনের সঙ্গে ব্যক্তিগত টিভি, ওয়াই-ফাই, মোবাইল চার্জিং পয়েন্টের পাশাপাশি অগ্নি সনাক্তকরণ ও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে সাউথ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের জন্য ১৩টি সিএনজি বাস কেনার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫.২০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অধীনে কলকাতা থেকে চলাচলের জন্য ১৮টি এসি মিডি বাস নামানো হবে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫.৫০ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও একাধিক বড় ঘোষণা করা হয়। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় মোট ১১টি নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ‘চা বন্ধু’ স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় এই তিন জেলাতেই বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালু করা হচ্ছে, যার ফলে চা বাগান ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা আরও সহজলভ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শিশু সুরক্ষা ও পরিচর্যার ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করতে ১৭টি শিশু যত্নকেন্দ্রেরও শুভ সূচনা করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কালিম্পংয়ের চারখোল এলাকায় এক্লব্য মডেল রেসিডেনশিয়াল স্কুলের শিলান্যাস করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনজাতি উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে নির্মিত এই স্কুলে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬.৮১ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন বলে জানানো হয়েছে। বিশেষত জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার ছাত্রছাত্রীরা আধুনিক আবাসিক শিক্ষার সুযোগ পাবেন।
মুখ্যমন্ত্রী মন্দির প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে ‘মহাকাল মহাতীর্থ’। এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হবে শিবের ২১৬ ফুট উচ্চতার বিশাল মূর্তি। একসঙ্গে প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থী এই মহাতীর্থে সমবেত হতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। শিলিগুড়ি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রয়োজনীয় জমি একটি ট্রাস্টের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হিডকোকে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরেই মন্দিরের পবিত্র শিলান্যাস সম্পন্ন হবে এবং এই মন্দির উত্তরবঙ্গের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠবে। প্রশাসনের আশা, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা পরিকাঠামো এবং পর্যটন ক্ষেত্র একসঙ্গে নতুন গতি পাবে।

