শিলিগুড়ি, ১ জুলাই:
অনেকেই অবসরের পর বিশ্রামের জীবন বেছে নেন। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ার বানেশ্বর চকের বাসিন্দা এক প্রাক্তন এনটিপিসি আধিকারিক ঠিক তার উল্টো পথেই হেঁটেছেন। দীর্ঘ ৩৯ বছরের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের সন্ন্যাসীকাটা এলাকায় গড়ে তুলছেন ‘আমাদের তপবন শান্তি সেবাশ্রম’—যেখানে ভবিষ্যতে অসহায়, বৃদ্ধ, অনাথ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য তৈরি হবে এক নিরাপদ আশ্রয়।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ডেপুটি ম্যানেজার পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের বাকি সময়টুকু সমাজসেবার জন্য উৎসর্গ করবেন। ২০২৪ সালের ১ জুন সাড়ে চার বিঘা জমি কিনে শুরু হয় আশ্রম নির্মাণের কাজ। এখনও অধিকাংশ কাজ বাকি থাকলেও প্রতিদিন নিজের হাতে সেই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা, শিল্পকলার প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা তাঁকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কবিতা, গান, বই লেখার পাশাপাশি তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত। চাকরির পাশাপাশি বহু মানুষের চিকিৎসা করেছেন এবং নেশামুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনতেও ভূমিকা নিয়েছেন।
তাঁর কথায়, করোনা পরবর্তী সময় তাঁকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ থেকেই তিনি অনুপ্রেরণা পান। তাই অবসরের পর আর ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবেননি।
ভবিষ্যতে এই আশ্রমে বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রম, গুরুকুল, ভেষজ উদ্যান, যোগকেন্দ্র, বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা এবং কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য। তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। নির্মাণকাজের মাঝেই নানা আর্থিক প্রতিবন্ধকতা, অসাধু চক্রের চাপ ও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তবুও থেমে যাননি।
বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চা-বাগান ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে একাই আশ্রমের কাজ দেখাশোনা করছেন তিনি। এলাকার মানুষ স্নেহ করে তাঁকে ‘দাদু’ বলেই চেনেন। ৬৫ বছর বয়সেও ম্যারাথন দৌড়, লেখালেখি, পড়াশোনা ও সমাজসেবায় সমানভাবে সক্রিয় এই মানুষটি প্রমাণ করে চলেছেন—অবসর মানেই জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, বরং নতুন এক মানবিক অভিযাত্রার শুরু।

