শিলিগুড়ি, ২৪ জুলাই:
পবিত্র উল্টোরথের শুভ তিথিতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, পূজার্চনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আসন্ন শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করল শিলিগুড়ির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো কমিটি সুব্রত সংঘ। শুক্রবার সকালে খুঁটি পুজোর মাধ্যমে শুরু হল ৬৯তম বর্ষের দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। ক্লাব প্রাঙ্গণে এদিন উপস্থিত ছিলেন উদ্যোক্তা, সদস্য, শুভানুধ্যায়ী এবং এলাকার বাসিন্দারা। পূজার্চনার মধ্য দিয়ে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করে শুরু হয় মণ্ডপ নির্মাণের শুভ সূচনা।
দীর্ঘ ৬৯ বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতি বছরই নতুন ভাবনা ও শিল্পনির্ভর উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের আকৃষ্ট করে সুব্রত সংঘ। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবছরের দুর্গাপুজোর মূল ভাবনা ‘আদি শক্তি’। উদ্যোক্তাদের কথায়, সৃষ্টির আদিতে যে অনন্ত, অবিনাশী, নিরাকার ও সর্বব্যাপী শক্তির অস্তিত্ব ছিল, সেই চিরন্তন মহাশক্তির দর্শনই এবারের মণ্ডপ, শিল্পসজ্জা এবং প্রতিমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হবে।
তাঁদের মতে, ‘আদি শক্তি’ শুধু দেবী দুর্গার প্রতীক নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টি, প্রকৃতি এবং জীবনের উৎস। মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টি, প্রতিটি প্রাণ এবং প্রতিটি শক্তির কেন্দ্রবিন্দু সেই আদ্যাশক্তি। এই দর্শনকে শিল্পের ভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবেন শিল্পীরা, যাতে দর্শনার্থীরা শুধু একটি সুন্দর মণ্ডপই না দেখেন, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতিরও অংশীদার হতে পারেন।
মণ্ডপে প্রবেশের পর থেকেই দর্শনার্থীরা অনুভব করবেন এক ভিন্ন পরিবেশ। আলো, রং, ভাস্কর্য, প্রতীকী শিল্পকর্ম এবং বিশেষ উপস্থাপনার মাধ্যমে সৃষ্টি, শক্তি ও চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে। ঐতিহ্য এবং আধুনিক শিল্পভাবনার সমন্বয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হবে, যা ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি দর্শকদের চিন্তারও খোরাক জোগাবে।
এবারের পুজোর অন্যতম বিশেষ দিক হল, মণ্ডপ নির্মাণ থেকে শিল্পসজ্জার অধিকাংশ কাজই করছেন শিলিগুড়ির স্থানীয় শিল্পীরা। স্থানীয় শিল্পীদের প্রতিভা, সৃজনশীলতা এবং দক্ষতাকে বড় মঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নিয়েছে সুব্রত সংঘ। উদ্যোক্তাদের মতে, বাইরের শিল্পীদের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদেরও সমান সুযোগ দেওয়া জরুরি। তাঁদের হাতের কাজের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে থাকছে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা। বিশেষ আলোক পরিকল্পনার মাধ্যমে সন্ধ্যার পর গোটা মণ্ডপ এক অন্য রূপ ধারণ করবে। আলো ও ছায়ার খেলায় ‘আদি শক্তি’র ভাবনাকে আরও জীবন্ত করে তোলার পরিকল্পনা করেছেন আলোকশিল্পীরা। দর্শনার্থীরা যাতে দিন ও রাত—দুই সময়েই ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন, সেই বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষের মিলন, সংস্কৃতি, শিল্প এবং সামাজিক দায়বদ্ধতারও উৎসব। তাই ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি এবছরও একাধিক সামাজিক উদ্যোগ ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা, সমাজসেবামূলক কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ক্লাব সদস্যরা।
পুজোর চারদিন থাকছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, নাট্য পরিবেশনা এবং স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জমে উঠবে সাংস্কৃতিক আসর। নতুন ও উদীয়মান শিল্পীদের প্রতিভা তুলে ধরার জন্যও বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, দুর্গাপুজো বাঙালির সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব, তাই সংস্কৃতিচর্চাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
খুঁটি পুজোর দিন থেকেই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে উৎসবের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। পূজার্চনা শেষে প্রসাদ বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনার আনন্দ ভাগ করে নেন সকলেই। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে মণ্ডপ নির্মাণের প্রস্তুতি। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিমা নির্মাণ, শিল্পসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রায় সাত দশকের পথচলায় সুব্রত সংঘ শিলিগুড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম পরিচিত নাম। প্রতিবছর নতুন ভাবনা, শিল্পসৌন্দর্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে দর্শকদের মন জয় করেছে এই পুজো। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবারের ৬৯তম বর্ষে ‘আদি শক্তি’র ভাবনাকে কেন্দ্র করে এক অনন্য শিল্পসৃষ্টি উপহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্লাব।
উদ্যোক্তাদের আশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আধ্যাত্মিক দর্শন, স্থানীয় শিল্পীদের অসাধারণ সৃজনশীলতা এবং নান্দনিক উপস্থাপনার সমন্বয়ে সাজানো এবারের দুর্গাপুজো শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের পুজোপ্রেমীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিল্পভাবনা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা মিলিয়ে ৬৯তম বর্ষের এই আয়োজন দর্শনার্থীদের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে বলেই বিশ্বাস সুব্রত সংঘের।

