শিলিগুড়ি, ২৩ জুন:
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে শিলিগুড়ি শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা। শহরের একাধিক ওয়ার্ডে জল জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত জল নিষ্কাশন পরিকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থার অভিযোগকে সামনে এনে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বাসিন্দারা। বৃষ্টির জল নামার কোনও উপায় না থাকায় বহু এলাকা এখন ছোটখাটো জলাশয়ের রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিলিগুড়ি পৌর নিগমের ৩১, ৩২, ৩৯, ৪০ এবং ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি হলেই এই সমস্ত এলাকায় জল জমে যায়। তবে এবারের টানা বর্ষণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাস্তাঘাট, গলি, আবাসিক এলাকা—সবই প্রায় জলের তলায় চলে গেছে। অনেক জায়গায় নর্দমার জল উপচে রাস্তায় উঠে এসেছে, আবার কোথাও সেই নোংরা জল বাড়ির ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। ফলে বহু পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বাসিন্দাদের একাংশ জানান, জলবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে গিয়ে তাঁদের নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ঘরে জমে থাকা জলের কারণে নষ্ট হচ্ছে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য গৃহস্থালির সামগ্রী। অনেক পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জল জমে থাকায় মশা ও বিভিন্ন রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রতিদিন স্কুলে যেতে হাঁটু সমান জল পেরোতে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের শিশুদের হাত ধরে জলমগ্ন রাস্তা পার করিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিতে হচ্ছে। জলমগ্ন রাস্তায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় অভিভাবকদের উদ্বেগও বাড়ছে। শুধু পড়ুয়ারাই নয়, কর্মসূত্রে বাইরে বের হওয়া সাধারণ মানুষও চরম সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।
বৃষ্টির জলে ঢেকে গেছে রাস্তার গর্ত, খানাখন্দ এবং ভাঙাচোরা অংশ। ফলে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গভীর গর্ত, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পথচারীদের পাশাপাশি স্কুটি, মোটরসাইকেল এবং চারচাকা গাড়ির চালকদেরও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বহু এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে, আবার কোথাও কোথাও যান চলাচল কার্যত ব্যাহত হয়েছে।
শুধু শিলিগুড়ি শহর নয়, সংলগ্ন ডাবগ্রাম, ফুলবাড়ি, মাটিগাড়া, নকশালবাড়ি-সহ বিভিন্ন এলাকাতেও জল জমার খবর পাওয়া গেছে। ওই সমস্ত এলাকায়ও রাস্তাঘাট ও আবাসিক অঞ্চলে জল জমে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানানো হলেও তার স্থায়ী সমাধান করা হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষাতেই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবং সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
এদিকে শিলিগুড়ি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বোর্ড ভেঙে যাওয়ার পর বর্তমানে প্রশাসকের হাতে পুর প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। সম্প্রতি একাধিক কাউন্সিলরের পদত্যাগ এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেই শহরের নাগরিক পরিষেবা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তাঘাট, নিকাশি ব্যবস্থা, জল নিষ্কাশন ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অব্যবস্থার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সমস্যাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অন্যদিকে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পূর্বাভাস সত্যি হলে জলমগ্ন শিলিগুড়ির পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। ইতিমধ্যেই বহু এলাকায় জল নামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
এখন সকলের নজর শহরের প্রশাসনের দিকে। জল জমা সমস্যার দ্রুত সমাধান, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি এবং জলবন্দি এলাকাগুলিতে জরুরি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। শহরবাসীর আশা, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে বর্ষার এই দুর্ভোগ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মেলে।

