আলিপুরদুয়ার, ১০ জুলাই:
নদীর জল আরও বাড়ছে কি না, সেই উদ্বেগে দিনের অধিকাংশ সময়ই মালঙ্গি ঝোড়ার ধারে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ নিরাপদ দূরত্ব থেকে, আবার কেউ ঝোড়ার একেবারে পাড়ে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন। বর্ষার বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠা মালঙ্গি ঝোড়া এখন কার্যত একটি প্রবল স্রোতস্বিনী নদীর রূপ নিয়েছে। কালচিনি ব্লকের সুভাষিণী চা বাগান সংলগ্ন এই ঝোড়ার ভয়াবহ ভাঙনে চা বাগানের বিস্তীর্ণ জমি এবং শ্রমিক মহল্লার শতাধিক পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে মালঙ্গি ঝোড়ার জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবল স্রোতে প্রতিনিয়ত পাড় ভেঙে পড়ছে। ইতিমধ্যেই চা বাগানের বেশ কিছু অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ক্রমশ শ্রমিক আবাসনের দিকে এগিয়ে আসায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে যে কোনও সময় একাধিক বাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে।
ভাঙনের প্রভাব শুধু চা বাগানেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিমধ্যেই হাসিমারা বায়ুসেনা ছাউনির সীমানা প্রাচীরের একটি অংশও ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত বছর তোর্সা নদীর বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ জল ও পলিমাটি সুভাষিণী চা বাগান এবং শ্রমিক মহল্লায় ঢুকে পড়েছিল। যদিও তখন বাগানের আউট ডিভিশন বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও স্থায়ী নদীবাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন রোধে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় তোর্সা নদীর মূল স্রোত ধীরে ধীরে গতিপথ পরিবর্তন করে মালঙ্গি ঝোড়ার দিকে চলে এসেছে। বর্তমানে সেই প্রবল জলধারা ঝোড়াকে কার্যত নদীতে পরিণত করেছে। এর ফলে ভাঙনের গতি আরও বেড়েছে এবং প্রতিদিনই চা বাগানের জমি ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন সেই ভাঙন শ্রমিক মহল্লার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে।
শ্রমিক সঞ্জয় রাউত বলেন, “নদী এখন আমাদের শ্রমিক মহল্লা থেকে মাত্র প্রায় ১২০ মিটার দূরে রয়েছে। এখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি পরিবার বসবাস করে। আমরা সবাই আতঙ্কে রয়েছি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র, কাপড়-চোপড় ও ঘরের দরকারি জিনিসপত্র আগেই গুছিয়ে রেখেছি। নদীর জল যদি আরও বাড়ে, তাহলে যে কোনও মুহূর্তে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে হতে পারে।”
অন্য এক বাসিন্দা সুরজ সিং বলেন, “সারাদিনে কতবার যে নদীর ধারে এসে জল দেখছি, তার হিসেব নেই। সবাই আতঙ্কে রয়েছি। বারবার এসে দেখছি জল আরও বাড়ছে কি না। যদি দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না হয়, তাহলে এবারের বর্ষায় হয়তো পুরো গ্রামটাই নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী নদীবাঁধ নির্মাণই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। পাশাপাশি তাঁরা প্রশাসনের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন।
বর্ষার বৃষ্টিতে নদীর জলস্তর আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় গোটা এলাকায় উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন প্রশাসন কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সুভাষিণী চা বাগান ও শ্রমিক মহল্লার শত শত বাসিন্দা।

