আলিপুরদুয়ার, ১৯ জুন:
আলিপুরদুয়ার জেলার হাসিমারা এলাকার ভার্নাবাড়ি চা বাগানে এক মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। নর্দমার জলে তলিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ তল্লাশির শেষে উদ্ধার হল চার বছরের এক শিশুকন্যার মৃতদেহ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগের তির ঘুরেছে এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা ও অবৈধ নির্মাণের দিকে। ঘটনার প্রতিবাদে কয়েক ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ জয়গাঁ–আলিপুরদুয়ার রাজ্য সড়ক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকালে ভার্নাবাড়ি চা বাগানের বাসিন্দা চার বছরের শিশুকন্যাটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক আত্মীয়কে বিদায় জানাতে রাস্তার ধারে গিয়েছিল। এরপর বাড়ি ফেরার পথে জলমগ্ন এলাকায় আচমকাই সে নর্দমার জলে তলিয়ে যায় বলে অভিযোগ। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে নিজেরাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে খবর দেওয়া হয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী বাহিনীকে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাসিমারা চৌপথি সংলগ্ন ভোলা নর্দমার উপর দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক অবৈধ নির্মাণ গড়ে উঠেছে। এর ফলে নিকাশি ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। বৃষ্টির জল এবং নর্দমার জল ঠিকমতো বেরোতে না পেরে পার্শ্ববর্তী এলাকায় জমে যায় এবং সেই জল ভার্নাবাড়ি চা বাগান এলাকায় ঢুকে পড়ে। বাসিন্দাদের দাবি, এই জলাবদ্ধতার কারণেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নর্দমা দখল করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন নির্মাণের মধ্যে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়িও রয়েছে। সেই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান হয়নি। শিশুকন্যার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা এলাকার এক জনপ্রতিনিধির বাড়ির সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উদ্ধারকারী দল। দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানো হয় নর্দমা ও সংলগ্ন এলাকায়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চলার পর কেন্দ্রীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা শিশুটির দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে সাতালি চা বাগান এলাকার একটি নর্দমা থেকে উদ্ধার হয় শিশুকন্যার দেহ।
দেহ উদ্ধারের পর তা নিয়ে যাওয়া হয় লতাবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল-এ। হাসপাতাল সূত্রে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা এলাকায়। পরিবার-পরিজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
অন্যদিকে, শিশুর মৃতদেহ উদ্ধারের পরেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জয়গাঁ–আলিপুরদুয়ার রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চালিয়ে যান। তাঁদের দাবি, নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কয়েক ঘণ্টা ধরে অবরোধ চলায় যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয় এবং রাস্তার দু’ধারে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
পরে পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হলে দুপুর প্রায় তিনটা নাগাদ অবরোধ প্রত্যাহার করেন বাসিন্দারা। এরপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় যান চলাচল।
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে উঠে এসেছে নিকাশি ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা এবং অবৈধ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও নিরীহ প্রাণ এভাবে ঝরে না যায়, তার জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শিশুকন্যার অকালমৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা, পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায় নির্ধারণের দাবিও জোরালো হয়েছে।

