আলিপুরদুয়ার, ২১ জুন:
ফের বুনো হাতির হানায় আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন আলিপুরদুয়ার জেলার গ্রামবাসীরা। বক্সা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা এক পাল হাতির তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলিপুরদুয়ার-২ নম্বর ব্লকের মহাকালগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের ছোট চৌকির বস এলাকার বাসিন্দারা। শনিবার গভীর রাতে হাতির পাল গ্রামে ঢুকে কৃষিজমি, ফসল এবং বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। স্থানীয়দের দাবি, এই ঘটনায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার গভীর রাতে বক্সা অরণ্য এলাকা থেকে একদল বুনো হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা বিভিন্ন কৃষিজমিতে হামলা চালায়। হাতির পালের তাণ্ডবে এলাকার বিস্তীর্ণ শশা ক্ষেত, ঝিঙে ক্ষেত এবং ধানের বীজতলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু কৃষক রাতারাতি তাঁদের কয়েক মাসের পরিশ্রম চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখেছেন।
গ্রামবাসীদের দাবি, হাতির পাল শুধু কৃষিজমিতেই ক্ষতি করেনি, একাধিক বাড়িতেও ঢুকে পড়ে। একটি বাড়িতে প্রবেশ করে কয়েক মন ধান খেয়ে ফেলে হাতিরা। পাশাপাশি বাড়ির রান্নাঘর ভেঙে দেয় এবং বিভিন্ন গৃহস্থালির সামগ্রী নষ্ট করে। হঠাৎ হাতির হানায় আতঙ্কে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। কেউ কেউ প্রাণভয়ে রাত কাটান নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, রাতভর হাতির দল গ্রামে ঘোরাফেরা করায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, টর্চের আলো জ্বালিয়ে এবং বিভিন্ন শব্দ করে হাতির দলকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে হাতিরা এলাকায় অবস্থান করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, মানব-হাতি সংঘাতের ঘটনা এই অঞ্চলে নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই হাতির হানায় কৃষিজমি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু ক্ষতির তুলনায় বনদপ্তরের ক্ষতিপূরণ অত্যন্ত কম। তাঁদের দাবি, এক বিঘা জমিতে শশা চাষ করে একজন কৃষক প্রায় এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। অথচ সেই জমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ হিসেবে মাত্র কয়েক হাজার টাকা দেওয়া হয়, যা প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় নগণ্য।
স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্য, ফসলই তাঁদের জীবিকার প্রধান ভরসা। ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করার পর যদি এক রাতেই সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার পর বনদপ্তরের কর্মীরা এলাকায় পৌঁছে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি হাতির চলাচলের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বনদপ্তরের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং হাতির অবস্থান সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলে প্রায়ই বুনো হাতির লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা ঘটে। খাদ্যের অভাব, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া এবং হাতির চলাচলের প্রাকৃতিক করিডর বাধাগ্রস্ত হওয়াকে এই ধরনের ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে একদিকে যেমন মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বক্সা জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় ফের হাতির তাণ্ডবের ঘটনায় আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, মানব-হাতি সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

