শিলিগুড়ি, ১৯ জুলাই:
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চা, সংস্কৃতি এবং আত্মপ্রকাশের এক অনন্য মঞ্চ হিসেবে পরিচিত ‘মেঘের মুলুক ২০২৬’ এ বছরও সফলভাবে সম্পন্ন হল। বনোমালার উদ্যোগে আয়োজিত এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক উৎসবের নবম সংস্করণ এবার শিলিগুড়ি শহর ও শহরতলির আটটি পৃথক ভেন্যু জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই সাংস্কৃতিক উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান রবিবার চার্চ রোডের সানডে হাট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক, গল্প বলা, চিত্রাঙ্কন, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, সৃজনশীল কর্মশালা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই ‘মেঘের মুলুক’-এর সূচনা হয়েছিল। ২০১৩ সালে মাত্র একটি ভেন্যুকে কেন্দ্র করে যাত্রা শুরু হলেও, ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ শিলিগুড়ির অন্যতম বৃহৎ শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এ বছর আটটি ভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এবারের উৎসবে শহর ও শহরতলির বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রান্তের শিশু-কিশোরেরা অংশগ্রহণ করে। কেউ গান গেয়েছে, কেউ নাচ পরিবেশন করেছে, কেউ আবৃত্তি, নাটক কিংবা গল্প বলার মাধ্যমে নিজের প্রতিভা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি ছিল চিত্রাঙ্কন ও হস্তশিল্প প্রদর্শনী, যেখানে ছোটদের কল্পনা ও সৃজনশীলতার অনন্য প্রকাশ দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভিভাবক, শিক্ষক, সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ এবং শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। শিশুদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা উপভোগ করতে সকাল থেকেই সানডে হাট প্রাঙ্গণে দর্শকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি পরিবেশনায় দর্শকদের উৎসাহ ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। আয়োজকদের মতে, শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে সমাজে এমন মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
বনোমালার সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় বলেন,
“মেঘের মুলুক শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি শিশুদের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। ২০১৩ সালে খুব ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ বহু মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতায় বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এবারের নবম সংস্করণে আটটি ভেন্যুতে বিপুল সংখ্যক শিশু অংশগ্রহণ করেছে, যা আমাদের আগামী দিনের কাজের অনুপ্রেরণা। ভবিষ্যতেও আরও বেশি শিশু-কিশোরকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।”
অন্যদিকে, সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম সহযোগী সংস্থা সানডে হাটের সদস্যা সংযুক্তা বসু বলেন,
“সানডে হাটে ‘মেঘের মুলুক’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। সংস্কৃতিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার যে ভাবনা নিয়ে আমরা কাজ করি, এই উৎসব সেই ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। শিশুদের অসাধারণ পরিবেশনা এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের মুগ্ধ করেছে। এমন উদ্যোগ শুধু শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশই ঘটায় না, সমাজে ইতিবাচক মানসিকতা ও সম্প্রীতির পরিবেশও তৈরি করে। ভবিষ্যতেও বনোমালার সঙ্গে থেকে এই ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা করতে আমরা আগ্রহী।”
আয়োজকদের দাবি, ‘মেঘের মুলুক’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। এখানে কোনও শিশু তার স্কুল, ভাষা, ধর্ম, আর্থ-সামাজিক অবস্থান কিংবা পরিচয়ের কারণে পিছিয়ে থাকে না। প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। সেই কারণেই প্রতিবছর আরও নতুন নতুন শিশু এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
শুধু সাংস্কৃতিক পরিবেশনাই নয়, এই উৎসবের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দলগত কাজের মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো মূল্যবোধও গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। অভিভাবকদের একাংশের মতে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ও ডিজিটাল মাধ্যমের প্রতি শিশুদের অতিরিক্ত নির্ভরতার মধ্যে এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ তাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নবম সংস্করণের সাফল্যে উৎসাহিত আয়োজকরা ইতিমধ্যেই আগামী বছরের পরিকল্পনা শুরু করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য, ‘মেঘের মুলুক’-এর দশম বর্ষকে আরও বৃহত্তর পরিসরে উদযাপন করা। আরও বেশি স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিশু-কিশোরকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়াই থাকবে আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।

