শিলিগুড়ি, ২৪ জুলাই:
উল্টোরথের পুণ্য তিথিতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, পূজার্চনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আসন্ন শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করল শিলিগুড়ির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো কমিটি উজ্জ্বল সংঘ। শুক্রবার সকালে খুঁটি পুজোর মাধ্যমে শুরু হল এবারের দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। ৭৩ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এবছরও দর্শনার্থীদের জন্য এক অভিনব ও দৃষ্টিনন্দন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। খুঁটি পুজোর দিন থেকেই ক্লাব প্রাঙ্গণে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের সদস্য, উদ্যোক্তা, এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং বহু পুজোপ্রেমী মানুষ।
এবারের দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে চলেছে অযোধ্যার ঐতিহাসিক রামমন্দিরের আদলে নির্মিত সুবিশাল মণ্ডপ। উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় নির্মিত রামমন্দিরের স্থাপত্যশৈলী, ভাস্কর্য, স্তম্ভ, খোদাই করা নকশা এবং ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যকে যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। দর্শনার্থীরা যাতে মণ্ডপে প্রবেশ করেই রামমন্দিরের আবহ অনুভব করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পনা করা হয়েছে প্রতিটি অংশের নির্মাণ।
এই বিশাল মণ্ডপ নির্মাণের দায়িত্বে থাকছেন ঝাড়খণ্ডের অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিল্পীরা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় থিমের মণ্ডপ নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁদের। সূক্ষ্ম কারুকাজ, নিখুঁত স্থাপত্য এবং নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে তাঁরা মণ্ডপটিকে জীবন্ত করে তুলবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন ক্লাবের কর্মকর্তারা। শুধু বাইরের সৌন্দর্য নয়, মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, আলোক পরিকল্পনা এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতি বছরই নতুনত্বের সন্ধানে হাজার হাজার দর্শনার্থী উজ্জ্বল সংঘের পুজো দেখতে আসেন। সেই প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে এবছরও এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি ও শিল্পকলার সমন্বয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হবে, যা সব বয়সের মানুষের কাছে সমানভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এবারের দুর্গাপুজোর জন্য প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বাজেটের আওতায় মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা, আলোকসজ্জা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ক্লাবের তরফে জানানো হয়েছে, পুজোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই মান বজায় রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমা নির্মাণেও থাকবে ঐতিহ্য ও শিল্পের মেলবন্ধন। সাবেকিয়ানা বজায় রেখেই দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরি হবে, যাতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য অটুট থাকে। মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিমা ও আলোকসজ্জার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই বিশেষ আলোর খেলায় মণ্ডপের সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বেড়ে উঠবে বলে আশা উদ্যোক্তাদের।
শুধু ধর্মীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না উজ্জ্বল সংঘের এবারের দুর্গাপুজো। উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, পরিবেশ রক্ষার প্রচার, প্রয়োজনীয় মানুষদের সহায়তা এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎসবকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুজোর চারদিন প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিলিগুড়ি ও আশপাশের এলাকার স্থানীয় শিল্পীরা সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মনোরঞ্জন করবেন। পাশাপাশি নতুন শিল্পীদের জন্যও মঞ্চ তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার অন্যতম বড় উৎসব।
খুঁটি পুজোর দিন থেকেই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই পূজার্চনা, প্রসাদ বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। প্রবীণ সদস্যদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মও সমান উৎসাহে পুজোর প্রস্তুতির কাজে অংশ নিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে দ্রুত গতিতে মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা গঠন এবং আলোকসজ্জার কাজ এগিয়ে চলবে।
দীর্ঘ ৭৩ বছরের পথচলায় উজ্জ্বল সংঘ শুধুমাত্র একটি দুর্গাপুজো কমিটি হিসেবেই নয়, বরং শিলিগুড়ির অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর নতুন চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপ এবং সমাজমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে এই পুজো শহরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবছরও ঐতিহ্য, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শিল্পসৌন্দর্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে এক স্মরণীয় দুর্গোৎসব উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে উজ্জ্বল সংঘ।
ক্লাব কর্তৃপক্ষের আশা, অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে নির্মিত মণ্ডপ, সুপরিকল্পিত আলোকসজ্জা, আকর্ষণীয় প্রতিমা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের ফলে এবারের ৭৩তম বর্ষের দুর্গাপুজো শুধু শিলিগুড়ি নয়, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।

